
কানাডার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক ব্যাংকার মার্ক কার্নির দায়িত্বগ্রহণের পর সাত মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতিতে তার উপস্থিতি একদিকে যেমন বুদ্ধিমত্তা ও স্থিরতার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনই কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে।
মার্ক কার্নির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার মেধা ও অর্থনৈতিক বোধ। ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নর হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুপরিচিত এক অর্থনীতিবিদ। রাজনীতিতে তুলনামূলক নতুন হলেও, তার নীতি নির্ধারণে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও আর্থিক জ্ঞানের প্রতিফলন দেখা যায়।
তার নেতৃত্বের ধরন শান্ত ও পরিমিত যা তাকে জাস্টিন ট্রুডো বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো আবেগনির্ভর রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে।
তবে কার্নির নেতৃত্বে কিছু সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তার পাঁচটি প্রধান দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন ঔদ্ধত্য, আন্ডার-ডেলিভারিং (প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা), দ্বৈততা, অস্পষ্টতা ও অটোয়াকেন্দ্রিকতা। তার সাম্প্রতিক “Union of the State”-ধাঁচের ভাষণেই এই দুর্বলতাগুলোর প্রতিফলন দেখা গেছে।
ভাষণটি ছিল প্রায় তিন হাজার শব্দের, যেখানে অনেকটা সময় তিনি নিজের অর্জন ও ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যায় ব্যয় করেছেন। সমালোচকরা বলছেন, এটি যেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নয়, বরং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ইতিহাস শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন এমন মনে হয়েছে। ভাষণে ছিল গল্প, তবে সেগুলোর কেন্দ্রবিন্দু ছিল একজন মানুষ মার্ক কার্নি নিজেই।
কানাডার রাজনৈতিক ইতিহাসে লিবারেলদের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বারবার এসেছে আত্মম্ভরিতা ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ। কার্নির মধ্যেও সেই পুরনো ব্যাধির ছায়া দেখা যাচ্ছে বলে অনেকেই মনে করছেন। তার ভাষণেও একধরনের আত্মবিশ্বাস-সীমালঙ্ঘন চোখে পড়েছে যেন তিনি একাই কানাডাকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেবেন।
রাজনীতিকেরা যখন দীর্ঘ সময় রাজধানীতে অবস্থান করেন, তখন তারা সাধারণ মানুষের বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন এই প্রথাগত অভিযোগ থেকে কার্নিও মুক্ত নন। অটোয়ায় দীর্ঘদিন বসবাস ও সরকারি পদে কাজ করার ফলে তার ভাষা, চিন্তাভাবনা ও নীতিতে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব স্পষ্ট। এর ফলে অনেক সময় তার বক্তব্য সাধারণ কানাডিয়ানদের কাছে জটিল ও দূরবর্তী বলে মনে হয়।
তার ভাষণে কার্নি বলেছেন, “আমরা কানাডিয়ানদের ক্ষমতায়ন করব, অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে নতুন কানাডা গড়ে তুলব এবং নজিরবিহীন বিনিয়োগ করব।” তবে সমালোচকদের মতে, এসব প্রতিশ্রুতি শোনায় ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো দেখা যায়নি। অনেকেই বলছেন, তিনি এখনো কথার চেয়ে কাজে পিছিয়ে আছেন যা একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকারের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত।
সব সমালোচনার মাঝেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই মার্ক কার্নি দ্রুত শেখেন। রাজনীতির জটিল সমীকরণ তিনি বুঝে নিচ্ছেন ধীরে ধীরে। দেশের অর্থনীতি ও জলবায়ু নীতিতে তার বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ইতিমধ্যে অনেকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
তবে সময় এখনো পুরোপুরি তার পক্ষে নয়। আগামী বছরগুলোই নির্ধারণ করবে মার্ক কার্নি কেবল একজন বুদ্ধিমান ব্যাংকার হিসেবেই স্মরণীয় থাকবেন, নাকি কানাডার রাজনীতিতে প্রকৃত এক নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠবেন।

