
শহরের প্রতিটি কোণে বইপ্রেমী ও শিক্ষার্থীদের কাছে জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরি (টিপিএল) আজ এক ভিন্ন মানবিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। গৃহহীনতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে থাকা নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে এই প্রতিষ্ঠান। নগরজুড়ে ১২টি শাখায় এখন চালু হয়েছে সামাজিক ও সংকট সহায়তা সেবা, যা লাইব্রেরির ভূমিকা ও ধারণাকে নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
সাধারণত লাইব্রেরি মানে যেখানে মানুষ আসে পড়তে, শেখার জন্য, কিংবা সামান্য সময় কাটাতে। কিন্তু এখন টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরি শুধু বইয়ের আশ্রয় নয়, অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে নিরাপত্তা ও সহানুভূতির স্থান। ২০২৩ সালে যখন লাইব্রেরির কর্মীরা গৃহহীন ও বিপন্ন মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, তখনই তাঁরা বুঝতে পারেন তাঁদের সেবার সীমাবদ্ধতা। শুধুমাত্র তথ্য বা সহানুভূতি নয়, বাস্তবিক সহায়তাও প্রয়োজন। এখান থেকেই জন্ম নেয় এই মানবিক উদ্যোগের।
টিপিএলের সামাজিক উন্নয়ন বিভাগের ব্যবস্থাপক আমান্দা ফ্রেঞ্চ বলেন, “আমরা আগে শুধু সাহায্যের কথা বলতাম, কিন্তু সত্যিকারে কিছু হাতে তুলে দিতে পারতাম না। তখনই বুঝলাম, আমাদের আরও এগোতে হবে কমিউনিটির ভেতরে গিয়ে বাস্তবিক সহায়তা দিতে হবে।”
২০২৩ সালেই টরন্টোর গার্সটেইন ক্রাইসিস সেন্টার–এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি শাখায় এই প্রকল্প শুরু হয়। এই সহযোগিতা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ এটি লাইব্রেরি ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে।
আমান্দা ফ্রেঞ্চ বলেন, “আমরা আমাদের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে সেবা দিতে চেয়েছিলাম। গার্সটেইনের সঙ্গে কাজ করা সেই ঘাটতি পূরণ করেছে। লাইব্রেরি এখন এমন মানুষদের কাছে পৌঁছাতে পারছে, যারা অন্য কোথাও যেতে পারেন না।”
গার্সটেইন ক্রাইসিস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক সুজান ডেভিস মনে করেন, এই অংশীদারিত্ব সমাজের সবচেয়ে বিপন্ন মানুষদের কাছে পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, “এই প্রকল্পের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র। এটি সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রকৃত উদাহরণ।”
শীতল আবহাওয়া, গৃহহীনতা, এবং মানসিক চাপে অনেক মানুষ এখন লাইব্রেরিকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। টিপিএলের প্রতিটি শাখায় প্রশিক্ষিত কর্মীরা এখন শুধু বই নয়, বরং তথ্য, পরামর্শ ও সংকট সহায়তা প্রদান করছেন। যাদের নিরাপদ আশ্রয় নেই, তাদের জন্য এটি এক অর্থে ‘সেফ স্পেস’ যেখানে কাউকে তাড়িয়ে দেওয়া হয় না, বরং শোনা হয়, বোঝা হয়, সহায়তা করা হয়।
২০২৪ সালের সেন্টার ফর অ্যাডিকশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ (CAMH)–এর প্রতিবেদন বলছে, কানাডায় বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ জানিয়েছেন যে তাঁরা মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছেন না। মহামারি–পরবর্তী সময় থেকে এই সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও গৃহহীনতার কারণে মানসিক অসুস্থতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বর্তমানে ১২টি শাখায় চলমান এই প্রকল্প টরন্টোর অন্যান্য শাখায় সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা নিচ্ছে টিপিএল। লক্ষ্য একটাই যেখানে মানুষ আছে, সেখানেই যেন সহায়তা পৌঁছায়। শহর প্রশাসনও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছে, কারণ এটি সরকারি স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ সেবার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করছে।
টরন্টো পাবলিক লাইব্রেরির এই রূপান্তর আধুনিক শহুরে সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় সহানুভূতি ও সহযোগিতা কখনও কেবল প্রতিষ্ঠানিক সীমায় আটকে থাকা উচিত নয়। বইয়ের পাতা থেকে বাস্তব জীবনের সেবায় টিপিএলের এই যাত্রা দেখিয়ে দিচ্ছে, মানবিক উদ্যোগের জন্য একটি শান্ত, উন্মুক্ত লাইব্রেরিও হতে পারে পরিবর্তনের সূতিকাগার।
This article was written by Sohely Ahmed Sweety as part of the LJI.

