
ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এলিজাবেথ ডেভিস। প্রথম দুই স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি এ কাজ করেন। তারপর ইসলাম গ্রহণ করে নতুন জীবনসঙ্গী খুঁজতে থাকেন। এমন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার জীবনে আসে একজন পুরুষ। তিনি জিহাদ আল শামি। পরিচয়ের পর তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এলিজাবেথ বলেন, এরপর জিহাদ তাকে ধর্ষণ করেন। কিন্তু জিহাদ আল শামি ছিলেন কট্টর। তিনি তার স্ত্রী এলিজাবেথকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কাছে শুধুই যৌন সুবিধা চাইতেন। এলিজাবেথের আগের সম্পর্কের সন্তানরা ধর্মান্তরিত হয়নি। ফলে তারা পশ্চিমা ধাঁচের খোলামেলা পোশাক পরে বাইরে যাওয়া-আসা করে।
এটাও তার পছন্দ হয়নি। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই জিহাদ আল শামিই ম্যানচেস্টারের হিটন পার্কে সিনাগগে হামলা চালায়। এসব নিয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, এলিজাবেথ ডেভিস যখন ম্যানচেস্টারের হিটন পার্কে সিনাগগে (ইহুদি উপাসনালয়) হামলার খবর শুনলেন, তখনই তিনি টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজ চালু করলেন। পর্দায় থাকা ঝাপসা হামলাকারীর ছবিটি দেখেই মুহূর্তে চিনে ফেললেন। হাতে অস্ত্র উঁচিয়ে, শরীরে ‘সুইসাইড বেল্ট’ পরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ব্যক্তিকে ঘিরে রেখেছে সশস্ত্র পুলিশ। তাকে দেখে এলিজাবেথের বুক হিম হয়ে গেল। কারণ টিভির পর্দায় তাকিয়ে থাকা মানুষটি আর কেউ নয়, তার কার থেকে দূরে থাকা স্বামী জিহাদ আল-শামি তিনি। তিন দিন আগেই জিহাদ তাকে বলেছিল, আমি ছুটিতে যাচ্ছি।
জিহাদ আল-শামির সঙ্গে এলিজাবেথের মাত্র এক বছরের বিবাহিত জীবন ছিল। কিন্তু বছরটা ছিল অশান্তি, ভয় আর নির্যাতনে ভরা। এই সম্পর্ক নিয়ে এলিজাবেথের পরিবার ও বন্ধুরা শুরু থেকেই ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি তখনও হুঁশ ফিরে পাননি যে, যাকে একসময় ভালোবেসেছিলেন, সেই মানুষই ধর্মের নামে একটি ইহুদি উপাসনালয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এমন সময় হঠাৎ তার বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়ে সশস্ত্র পুলিশ।
পরের দৃশ্যটি তার এখনো স্পষ্ট মনে আছে- সামনে তাক করা বন্দুক, আর চিৎকার করে বলা আদেশ: ‘হাঁটু গেড়ে বসো!’ পরে পুলিশি হেফাজত থেকে মুক্তি পেয়েছেন এলিজাবেথ। এখন তিনি নীরবতা ভেঙে নিজের ভয়াবহ জীবনের কথা বলেছেন ডেইলি মেইলকে।
৪৬ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা এলিজাবেথ একসময় বৃটেনের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তিনি মুসলমান হয়েছিলেন স্বেচ্ছায় এবং সেখানেই তিনি অনলাইনে আল-শামির সঙ্গে পরিচিত হন ইসলামী ডেটিং অ্যাপ মাজম্যাচ (বর্তমানে মুজ)-এর মাধ্যমে। তার কথায়, জিহাদ ছিল অতি মাত্রায় যৌন আসক্ত এবং নিয়ন্ত্রণপ্রিয়। এ বছরের শুরুতে যখন সে বুপা থেকে চাকরি হারায়, তখন থেকেই আরও অস্থির, বিচ্ছিন্ন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।
দুই দশক ধরে হাসপাতালের কাজে যুক্ত এলিজাবেথ ২০২৪ সালের শুরুতে এই অ্যাপে যোগ দেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি জীবনের দুটি বড় শোকের মুখোমুখি হন। প্রথমে ২০১৭ সালে তার পাঁচ সন্তানের পিতা ক্যান্সারে মারা যান। এরপর তিনি ওয়েলসের এক ব্যক্তির প্রেমে পড়েন। কিন্তু তিনিও অসুস্থ হয়ে মারা যান। দ্বিতীয়বারের এই শোকের পর এলিজাবেথ জীবনের অর্থ খুঁজতে শুরু করেন। অবশেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফার্নওয়ার্থের স্থানীয় এক মসজিদে তিনি ‘শাহাদাৎ’ পাঠ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মান্তরিত হন। তিনি বলেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আমি নিজেকে ধর্মহীন মনে করতাম। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু কোনো ধর্ম চর্চা করতাম না। দুইজন প্রিয় মানুষকে হারানোর পর জীবন নিয়ে প্রশ্ন জাগে। কেন এমন হলো, জীবনের উদ্দেশ্য কী? তখনই আমি ইসলামের দিকে ঝুঁকি। এলিজাবেথের ভাষায়, ইসলাম সুন্দর ধর্ম- যদি কেউ সঠিকভাবে অনুসরণ করে। মুসলমানরা একে অন্যের খেয়াল রাখে, তারা সদয় থাকেন, দান করেন- এগুলো আমাকে আকৃষ্ট করেছে।
জিহাদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে প্রথমে তার পরিবার অবাক হয়। কিন্তু পরে তারা মেনে নেয়।
এলিজাবেথ বলেন, তারা ভেবেছিল এটা হয়তো কোনো সাময়িক পর্যায়। কিন্তু আমি বলেছিলাম, না- এটা আমার সিদ্ধান্ত, আমি মুসলিম হয়েছি। সবাই পরে বুঝে যায়। ধর্মান্তরের পর তিনি আশা করেছিলেন একজন মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করবেন। তিনি এমন একজন, যিনি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সংসার গড়বেন। এই আশাতেই তিনি অ্যাপে আল-শামির সঙ্গে পরিচিত হন। আল-শামি তখন অ্যাপে নিজের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ইংরেজি অংক্ষর ‘জে’ ব্যবহার করতেন- অর্থাৎ নামের অংশ ‘জিহাদ’ বুঝাতে তিনি এটা করতেন। প্রথমে বার্তা আদান-প্রদান, পরে ফোনালাপ। বিশেষ করে তার ইসলাম গ্রহণ নিয়ে কথা বলার পর দু’জন দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। এলিজাবেথ বলেন, আমি বলেছিলাম, আমি এমন কাউকে চাই, যার সঙ্গে মূল্যবোধ মেলে, যিনি ইসলামীভাবে বিয়ে করতে চান। প্রথমে ওকে খুব একটা পছন্দ হয়নি। কিন্তু কথা বলতে বলতে কিছুটা ভালো লাগতে শুরু করে।
ছয় মাসের মধ্যে তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। আর জুন মাসের দিকে আল-শামি বারবার তাকে বিয়ের জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। এলিজাবেথ শুরুতে রাজি হননি। বলেন, আমি এখনো প্রস্তুত নই, সময় লাগবে। কিন্তু আল-শামি থেমে থাকেননি। একদিন হঠাৎ তাকে নিজের বাবা-মায়ের বাড়িতে ডেকে বলে, তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। এলিজাবেথ বলেন- ঘরে ঢুকেই দেখি ফুল, চকোলেট, পারফিউম সাজানো টেবিল। সে হাসছে। বললাম, ‘এইসব কেন?’ সে বলে, ‘বসো, একটু পর কেউ ফোন করবে।’ তারপর বুঝলাম কী হচ্ছে- সে ফোনে কারও মাধ্যমে বিয়ের ব্যবস্থা করেছে!
ফোনের অপর প্রান্তে কেউ আরবি ভাষায় কিছু উচ্চারণ করতে থাকেন, যা এলিজাবেথ বুঝতে পারেননি। আল-শামি শুধু বলেন, তুমি শুধু হ্যাঁ, হ্যাঁ বললেই হবে। এভাবেই- একেবারে আকস্মিকভাবে তার ইসলামিক বিয়ে হয়ে যায় এক বসার ঘরে। এলিজাবেথ পরে বলেন, সবকিছুই অদ্ভুত ছিল। আমি চাপের মুখে পড়ে বিয়েটা করি। কিন্তু বুঝিনি- সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ভুল হবে।
এলিজাবেথ মনে করেছিলেন বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল ‘অদ্ভুত’ এবং তিনি জোরপূর্বক অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু যখনই তিনি তাদের সম্পর্কের সমস্যার কথা তুলতেন, আল-শামি বলতেন, পরে কথা বলব- যদিও তারা কখনোই সে বিষয়ে কথা বলতেন না
বিয়ের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আল-শামির আচরণ বদলে যেতে থাকে। এলিজাবেথ এখন বুঝতে পারেন, সেটি ছিল ক্লাসিক মানসিক ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শুরু। এলিজাবেথ স্মরণ করেন, কখনও সে খুব ভালো ব্যবহার করত, আবার কখনও খুব নিয়ন্ত্রণমূলক হয়ে যেত। একবার আমি দেরি করেছিলাম, আর সে আমার গলায় হাত দিয়ে ধরল এবং বলল, ‘তোমাকে কতবার বলেছি দেরি না করতে?’ আমি বলেছিলাম, ‘আমি ট্রাফিকে আটকে ছিলাম, সঙ্গে সঙ্গে আসতে পারিনি।’
সে তখন বলল, ‘আমি তো বলেছি সময়মতো আসতে। তোমার স্বামীর কাছে ক্ষমা চাও।’ তারপর তার হাতের চাপ আরও শক্ত হয়ে যেত, সে বলত, ‘বল, দুঃখিত বলো।’
কখনও আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম, তখন সে ছেড়ে দিত। কিন্তু অন্য সময় তার থাবা এতটাই শক্ত হয়ে যেত যে আমাকে বাধ্য হয়ে ক্ষমা চাইতে হতো। এরপর আরও নানা সমস্যা দেখা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে আল-শামি অভিযোগ তোলে যে এলিজাবেথের প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের আচরণ তার পছন্দ নয়। তিনি বলেন, এক রাতে সে রেগে গেল, কারণ আমার ছেলে একটা বিয়ার খাচ্ছিল। সে বলল, আমি আর তোমার বাড়িতে আসব না। তোমার ছেলেমেয়েরা খুব পশ্চিমা জীবনযাপন করছে, মেয়েরা খোলামেলা পোশাক পরে বাইরে যায়, বয়ফ্রেন্ড আছে- এটা আমি মেনে নিতে পারব না।
এলিজাবেথ বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে তিনি মুসলিম হলেও, তার সন্তানরা তা নয়। তাই তাদের ওপর ধর্ম চাপানো অন্যায় হবে। কিন্তু আল-শামি কিছুই শুনতে চাইল না। এরপর সে এলিজাবেথকে বলতে শুরু করে কীভাবে পোশাক পরতে হবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখতে হবে। এমনকি পায়ের পাতাও দেখা যাবে না। এলিজাবেথ বলেন, সে বলেছিল, যদি আমি চুল বা পা ঢেকে না রাখি, তাহলে সে এমন একজন পুরুষ হিসেবে গণ্য হবে, যে তার স্ত্রী বা পরিবারের নারী সদস্যদের পর্দাহীনভাবে বাইরে যেতে দেয়, যা ইসলামে পাপ।
সবচেয়ে বড় সংকট আসে গত বছরের শেষ দিকে, যখন এলিজাবেথ গর্ভবতী হন। খবরটি জানার পর আল-শামি তাকে গর্ভপাত করানোর আদেশ দেয়। এলিজাবেথ রাজি হননি। সে তাকে ভয় দেখিয়ে বাধ্য করার চেষ্টা করলেও তিনি নিজের অবস্থানে অটল থাকেন।
দুই মাস পর, ডিসেম্বর ২০২৪-এ, তার গর্ভপাত হয়ে যায়। দুঃখে ও শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগতে থাকা অবস্থায় তিনি আল-শামির কাছে সমর্থন চেয়েছিলেন। কিন্তু সে একটুও সহানুভূতি দেখায়নি। সে একদমই পরোয়া করেনি- বলেন এলিজাবেথ। শুধু বলেছিল, ‘আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে।’ হাসপাতালে পর্যন্ত যায়নি। আমার পরিবারই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।
আরও ঘৃণ্যভাবে গর্ভপাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আল-শামি তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, রক্তপাত বন্ধ হয়েছে?- যেন সে আবার শারীরিক সম্পর্ক করতে পারে। সূত্র : মানবজমিন

