
কেমন আছিস দোস্ত? সে যে গেলি একটা ফোনও করার সময় পেলি না। যদিও মেছেঞ্জার এ কথা হয় টুকটাক। কী যে আনন্দে কাটালাম দুই বন্ধু কয়েকদিন। সব চাইতে মজার ছিল আমাদের ফল (ঝর্না) দেখতে যাওয়া তাই না? আমরা ভুল করে সোজা পথ ছেড়ে হাইকিং করার পথ দিয়ে রওনা হয়েছিলাম। সে কী কাণ্ড আগের রাতে বৃষ্টি হওয়ার ফলে কাদাপানিতে মাখামাখি পথ। তোর পায়ে চার ইঞ্চি হিল জুতা। আমার পায়ে সমতলে হাটার মতো চপ্পল। সাথে কোনো খাবার নাই, ছোট এক বোতল পানি। কিট কেটের একটা বার যেটা সব সময়ই আমার হাত ব্যাগে থাকে আর অর্ধেক খেয়ে ফেলা একটা চিপসের প্যাকেট। এতটুকু সম্বল নিয়ে আমরা পথ চলতে শুরু করেছিলাম। তোকে দেখে মনে হচ্ছিল এই মুহূর্তে তুই হুমড়ি খেয়ে পড়ে কোমর ভাঙবি আর আমি পা ভাঙবো। কিন্তু আমাদের যে ভুল পথ প্রর্দশক (আমার স্বামী) তিনি বিন্দু মাত্র ভয় না পেয়ে তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে আর আমাদের সাহস যোগাচ্ছে। আমার প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল আমরা মধ্য বয়স পেরিয়ে যাওয়া দুই নারী যদি এখানে আহত বা নিহত হই উদ্ধারকারীরা আসাটাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার হবে। পরদিন খবরের হেড লাইন হবে বীণা প্রস্তুতিতে হাইকিং করতে গিয়ে বাংলাদেশী দুই নারী ক্রিটিক্যাল অবস্থাতে হাসপাতালে আছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বেশ কিছুটা দুর্গম পথ বহু কষ্টে এবং আতঙ্কে পার হওয়ার পর আমরা কিছুটা ভালো পথের দেখা পেয়েছিলাম। তোর মনে আছে দুলু, কী যে সুন্দর সরু আঁকাবাঁকা মেঠো পথ। মনে হচ্ছিল গ্রামের কোনো পথে আমরা হাঁটছি। দুই পাশে অসাধারণ সুন্দর বুনো ফুল সুভাস ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর তুই তোর কাঁদামাখা চার ইঞ্চি হিল পরে সমানে ছবি তুলছিলি আর ভিডিও করছিলি সাথে সাথে আমরা বেসুরো গলাতে গেয়ে চলেছিলাম, ‘গ্রাম ছাড়া এই রাঙ্গামাটির পথ আমার মন ভোলায় রে।’
অবশেষে পাচল্লিশ মিনিট হাঁটার পর পাকা সমতল পথ পেয়ে আমাদের আনন্দের শেষ ছিল না। এই বুঝি এসে গেলাম ঝর্নার কাছে। একটা পরিবারকে দেখলাম বসে কফি খাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাস করলাম ফল আর কত দূর? ওরা জানাল পাঁচচলিশ মিনিট। এটা শুনে তো তোর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল। তুই বলে উঠলি, অসম্ভব আমি আর হাঁটতে পারবো না। তারপরে তিনজনে ছোটখাট একটা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিলাম, এতটা পথ যখন চলে এসেছি ভুল পথে উঠে, তাহলে সঠিক পথে হেঁটে ঝর্নাটা দেখেই যাই।
আবার হাঁটা ততক্ষণে তোর চার ইঞ্চি হিল জুতা পা থেকে হাতে উঠে এসেছে। প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটার পরে ফিরতি পথে আসা কয়েকজনকে জিজ্ঞাস করলাম আর কতদুর ঝর্না? জবাব এলো পনেরো মিনিট। বলে কী আরো পনেরো মিনিট? কিন্তু কিছু করার নাই এতটা পথ যখন চলে এসেছি ফিরে যাবার প্রশ্নই উঠে না। আরো দশ মিনিট হাঁটার পর আবারো একজনকে জিজ্ঞাস করলাম আর কতদূর জবাব এলো আবারো পনেরো মিনিট। যাই হোক অনেক সংগ্রামের পরে আমরা ঝর্নার দেখা পেলাম। আমরা এত বেশি ক্লান্ত ছিলাম যে ঝর্নার সৌন্দর্য আমাদের অভিভূত করতে পারেনি। কিন্তু অন্যান্য সবাই মুগ্ধ হয়ে দেখছিল পানির অবিরাম দৃশ্য।
ঝর্নার পাশে বসে আমাদের খাদ্য সম্বল একটা কিটকেট বার একটা পানির বোতল আধা প্যাকেট চিপস তিনজন ভাগাভাগি করে খেয়েছিলাম। কিন্তু তুই ঠিকই ভিডিও করলি ছবি তুললি শত শত। এবার ফেরার পালা। ফেরার পথটা আমাদের তেমন ক্লান্ত লাগেনি। কারণ তখন আমাদের পথ ভুল ছিল না। কথা বলতে বলতে পথ ফুরিয়ে গেছিল। তাছাড়াও মনে ছিল ফিরে যাবার স্বস্তি। তবে ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী তখন গদ্যময় আমাদের কাছে। গাড়িতে উঠেই সরাসরি ম্যাকডোনাল্ডে ঢুকেছিলাম।
যাই বলিস বন্ধু এই ঝর্না দেখার অভিজ্ঞতা কোনোদিনও ভুলবো না। তুইও যেন ভুলে না যাস সে জন্য দীর্ঘ চিঠি লিখে আমাদের এভারেস্ট বিজয়টা মনে করিয়ে দিলাম। তবে এমন ভুল যেন কখনো না হয় সেটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। ভালো থাকিস বন্ধু। চিঠি লিখে চিঠির জবাব দিস। আবার কবে আসবি জানাস।
ম্যাল্টন, কানাডা

