ছেলেটা এগুচ্ছে

ছেলেটা এগুচ্ছে - the Bengali Times
ছেলেটি ভাবে পা দুটো তার কে বেঁধে রাখে সেই থেকে বড় হবার যাত্রা প্রতিদিন সে ভাঙ্গতে থাকে গতকালের মাত্রা চলছে তো চলছে চলেই যাচ্ছে

মা বলতেন, ছেলেটি কবে বড় হবে?

ছেলেটি ভাবে, পা দুটো তার কে বেঁধে রাখে? সেই থেকে বড় হবার যাত্রা। প্রতিদিন সে ভাঙ্গতে থাকে গতকালের মাত্রা। চলছে তো চলছে, চলেই যাচ্ছে।

- Advertisement -

ছেলেটি এগুচ্ছে।

মা ডাকেন, খোকা ঘরে আয়। খোকা বলে অবেলায় ডেকো না মা।

বাজপাখির মত দৃষ্টি তার। আগত সময় এবং জীবন চক্রকে বসে বসে পাহারা দেয়। একদিন সে কৈশোর প্রাপ্ত হয়। কিছু বোঝে আবার বোঝে না অনেক কিছু এমন একটা সময় পার করে দেয়। যেসব ব্যাপারে মা প্রশ্ন করেন কিংবা আগ্রহ নিয়ে ছেলের মনের ভাব বুঝতে চেষ্টা করেন, ছেলেটি মায়ের কৌতূহলী মাথায় হাত রেখে বলে, হবে হবে – সব হবে মা। ষোল বিঘা ছাড়িয়ে যায় মায়ের হাসি।

ছেলেটি এগুচ্ছে।

এলো যৌবন। শরীরে তার প্রমাণ দেখা দেয়। শরীর মেজাজ দুটোকেই নিয়ন্ত্রণে রেখে ছেলেটি বুদ্ধির পেছনে ছোটে। ছেলেটা এগুচ্ছে। মেয়েটির মত সে স্বপ্ন দেখে না। সে দেখে ছায়া। মাটিতে দাগ কেটে রেখে যায় প্রতিদিনের বড় হওয়া। শুধুশুধু বড় হওয়াকে সে স্বপ্ন মনে করে না, বলে টিকে থাকার লড়াই কিংবা একটা জ্বলন্ত কড়াই।

দেখতে দেখতে মেয়েটি রঙধনু শিস শুনতে অভ্যস্ত হয় পড়ে। সেও বড় হয়। দৈনন্দিন কাজে পাবলিক বাসে পিষ্ট হয়ে পাঁপড়ের মত ভেঙ্গে যেতে থাকে। ওর চোখে জমা মেঘ অথচ সমস্ত আর্দ্রতা কাপড়ের মত শুকিয়ে ফেলে বাতাসে রোদ্দুরে। মেয়েটি এবং উঁচুতে ওঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বড় হওয়া ছেলেটি একই ক্লাসে পড়ে। একই সাথে পথ চলে, চলে মানে সেই ছোট বেলা থেকে চলে আসছে।

ছোটবেলায় ওরা কদম গাছে উঠেছে একজনের ঘাড়ে অন্যজন পা রেখে। ছোটবেলায় একসাথে রাত কাটিয়েছে লেপের নিচে। এ বাড়ি ও বাড়ির ছেলে-মেয়ে ওরা। সে অনেক আগের কথা। ওদের সব খেলা ছিল খেলাধুলার মতই। কাদামাটি দিয়ে শুরু করে পাতার বাঁশি- সবই।

একদিন মেয়েটির জামা ধরে টান দিয়ে সে থমকে যায়। অনেক রাগ হয়ে তবেই টেনেছিল মেয়েটির জামা। মেয়েটির জন্যই ওর ঘুড়ি কাটা গেছে। তাই ভেবেছিল পুলিশের মত জেরা করবে। দরকার হলে দুচারটা কিল দিবে পিঠে। কিন্তু মেয়েটির জামার নিচে লুকিয়ে ছিল ছেলেটিকে থামিয়ে দেবার জমা অহংকার। তাই দেখে ছেলেটি পিছু হটে যায়। সেই থেকে বদলে যায় খেলাধুলার ধরণ। কেননা বয়সের ডাক অবজ্ঞা করে ছেলেটি, সে চলতে থাকে বড় হবার পথে।

মেয়েটি এখন বসন্ত বোঝে, শ্রাবণ বোঝে, বোঝে চৈত্রের দহন। তবুও সে মৌন থাকে। ঘরে তার একাকী মা, বোনটাও নির্যাতিতা পাড়ার বখাটেদের হাতে। মুরুব্বি বলতে অন্ধ একজন খালা আছেন, সেও না থাকার মত।

টিউশনি শেষ করে মেয়েটি একদিন চলে আসে টি এস সি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ছেলেটি এলে প্রশ্ন করে, আর কত বড় হবে তুমি? কত বড় হলে শেষ হবে বড় হওয়ার নেশা? এদিকে আমি যে ছোট হয়ে আছি সেই ছোটবেলা থেকে। পাশাপাশি থেকেও অনেক ছোট। বড় হওয়াকে অভিশাপ দিতে ইচ্ছে করে। আজীবন কেন খেলাধুলা করে কেটে গেল না আমাদের। কেন এত বড় হতে চাও? নিজের থেকেও বড়!

ছেলেটি বিস্মিত! তাকে বড় হতে বাঁধা দেয় এমন সাহস কে কোথায় পায়? ছেলেটি এগিয়ে যায়। যেতে যেতে সুযোগ বুঝে দৌড় দেয়। এক পর্যায় মেয়েটির হাত থেকে ছুটে যায় বড় হতে চাওয়া ছোট্ট একটি হাত।

মেয়েটি নিজের হাত দেখে। উষ্ণ থেকে শীতল হতে থাকে তার নরম দুটি হাত। তার মনে পড়ে অতীতের সব অবহেলা। নিজের বানানো কাগজের নৌকা ডুবে গিয়েছিল বলে ছেলেটি মেয়েটির কাগজের নৌকা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। মেয়েটি বলেছিল দেখ দেখ আমার কাগজ কি সুন্দর ভেসে যাচ্ছে। তোর নৌকা তো ডুবে গেল। একথা বলা মাত্র ওকে ধাক্কা দিয়ে পুকুরের পানিতে ফেলে দিয়েছিল। এমন কত কথা রয়েছে ওদের। এতো কিছু হয়ে গেল তবু মেয়েটি পরের দিন সকালে এক থালা কুলি পিঠা নিয়ে এসে বলল, নে খা। মা তোর জন্য কাল রাতে বসে বসে কুলি পিঠা বানিয়েছে।

ছেলেটি যেদিন দিগন্ত ছোঁয়ার জয় পাবার জন্য দৌড় দিল সেদিন সারা রাত বসে বসে মেয়েটি ভাবল বড় হওয়ার অতীত সব কথা। এক পর্যায়ে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, বড় ওরা ঠিকই হয়েছে তবে দু’জনের মধ্যে কেউ দেখতে পায় কেউ পায় না।

সত্যি সত্যি মেয়েটিকে আজ অনেক বড় মনে হচ্ছে। শূন্য থেকে উপড়ে থাকা মানেই তো বড় হওয়া। কাজেই সে বড়। ছেলেটি নিশ্চয় এখনো মাটিতে পা ফেলে হাঁটছে। কাজেই শূন্যতার উঁচু সে কি করে বুঝবে। কি করে বুঝবে বড় হওয়াটা আপেক্ষিক।

এই গল্পে কোন চরিত্রের নাম নেই। নাম নিয়ে কাউকে বড় বা ছোট করা ঠিক না। যেমন মেয়েটি একদিন বলেছিল,আমার পায়ের নিচে তোমার হাতদুটো পেতে দিবে। ছেলেটি বলেছিল কেন? মেয়েটি বলেছিল তাহলে হাতে উঠে জগতটা দেখতাম। ছেলেটি বলেছিল, তিনি ইঞ্চি লম্বা হওয়া ছাড়া তুমি আর কিছুই দেখতে পাবে না।

মেয়েটি বোধ হয় একটু রাগ করেছিল। তাই বলল, বড় হওয়া ছাড়া তুমি কি কিছুই বোঝো না?

ছেলেটি চলে যাবার পর সারারাত নিজের মত করে অনেক কিছু ভাবল মেয়েটি। একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, আহা স্বপ্ন নীড়! ওদের সন্তান হলে নাম রাখা হতো ‘পৃথিবী’। না জানি পৃথিবী দেখতে কেমন হত। একটা চিরকুট লিখে ঝুলে পড়ল মেয়েটি।

ঝুলতে ঝুলতে কতোটুকু বড় হওয়া যায় তাই দেখতে চেয়েছিল মেয়েটি। পায়ের উপর না হোক দড়িতে সে বড় হতে চেয়েছিল।

বিছানার ওপর পড়ে থাকে মেয়েটির নিজ হাতে লেখা চিরকুট। ‘পৃথিবী হলো না দেখা’।

 

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles