সহেনা যাতনা

সহেনা যাতনা - the Bengali Times
আমার যন্ত্রনা এখনও কাটে নি বিষয় বাংলাদেশের দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা ও মনুষ্যত্ব হরণ

আমার যন্ত্রনা এখনও কাটে নি। বিষয়: বাংলাদেশের দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা ও মনুষ্যত্ব হরণ। আপনারা কেউ যদি বাংলাদেশের মাটিতে জন্মগ্রহণ করে থাকেন, তবে নিশ্চই মনে আছে, ছোট ছোট বাচ্চারা জ্যান্ত ফড়িং ধরে তার পায়ে সুতো বেঁধে খেলা করে। কিংবা প্রজাপতি ধরে কাঁচের জারে পুরে রাখে। উদাহরণ আরও দেওয়া যায়, যেমন রাস্তার কুকুর নিয়ে নানারকম খেলা।এতো গেল ছোট বাবুদের কথা। মনে আছে, আরব দেশগুলোতে শখের বশে উটের দৌড় প্রতিযোগিতা হত এবং তার উপরে ছোট ছোট বাচ্চাদের বসিয়ে উটগুলোকে দৌড় দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হত? আমি বান্দর স্বভাবের ছিলাম বলে আমার মা ছোটবেলায় ভয় দেখাতেন, বলতেন, ছেলেধরা ধরে নিয়ে উটের জকি বানাবে।

এখন আমার সেই ফড়িংটা, প্রজাপতিটা, কুকুর, বেড়াল, পাখি, উট হয়ে তাদের মনের কথা জানতে ইচ্ছে করে। অত্যন্ত লজ্জাজনক হলেও, আমি মাংসাশী প্রাণী। খাদ্যের জন্য, জীবিকা ও জীবনের প্রয়োজনে প্রাণীর ব্যবহার নিয়ে আর একদিন লিখব। তবে এই যে খেলার ছলে, বাচ্চাবয়সেই একটি ফড়িং এর ডানা ভেঙে দিলে যে তিনি ব্যাথা অনুভব করেন কিংবা মৃত্যুবরণ করেন, তা কিন্তু সেই ছোট বাবুগুলো কখনও উপলব্দ্ধি করেন নি। করবেন কিভাবে? খুব কম অভিভাবকই প্রাণীদের ভালোবাসা ও সন্মান করার বোধ তাদের সন্তানদের শিখিয়ে দেন। হাজার বছরের এই প্রচলন হয়ত বেশিরভাগ বাবা মা নিজেরাও উপলব্ধি করেন না। তাই খেলার ছলে যে নৃশংসতা ফড়িংটির প্রতি দেখানো হয়েছে, তা সেই বাবুটি বড় হওয়ার সাথে সাথে তার মানসিকতার সাথেই বড় হয়।

- Advertisement -

আচ্ছা এমনটি কি হতে পারে, এই যে দুর্বলের প্রতি অত্যাচার অনাচার তা এই মানসিকতারই একটি ফল? এমন কি হতে পারে একজন ধর্ষক তার শিকারকে মানুষ হিসেবেই গন্য করছে না, কেবলই সেই ফড়িংটির মত একটি খেলনা মনে করছে? হয়ত দৈহিক গঠন অন্যরকম হওয়ার কারনে অসুস্থ কৌতুহল কাজ করে। অন্য লিঙ্গের সম্পর্কে অল্প শিক্ষা হওয়ার জন্য নৃশংসতা যুক্ত হয়।কারন সে হয়ত ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে তার বাবা কিভাবে তার মাকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করেছে কিংবা পাড়া প্রতিবেশী অথবা আত্মীয় স্বজন তার সামনে নারী পুরুষের বিভেদকারী অসংখ্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছে। কে বলবে সে নিজেই ধর্ষনের শিকার নয়? আমরা কি নিজেদের মনের অজান্তেই একটি ধর্ষক জাতি গড়ে তুলছি না?

আপনি যদি অভিভাবক হয়ে থাকেন তবে বলুন তো, আপনাদের মধ্যে কতজন বাবুটিকে নিয়ে হিন্দী সিনেমা দেখার আগে বিচার করেন যে সিনেমাটি তার বয়সের উপযোগী কিনা? দক্ষিন এশিয়ার বেশিরভাগ সিনেমাই বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়।

বলুন তো,কতজন অভিভাবক প্রকৃত, সুস্থ এবং উপযুক্ত যৌন শিক্ষা বয়স অনুযায়ী আপনার বাবুটিকে দিয়েছেন?তারা যৌন শিক্ষা পাচ্ছে তাদের বন্ধু, ইন্টারনেট ও নীলছবি থেকে।সম্পূর্ণ শিক্ষাটাই যেখানে ভুল ভ্রান্তি ও অসুস্থতায় পরিপূর্ন।আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে মৌলিক বিষয়টি নিয়ে নিজেদের সন্তানদের সাথে কথা বলতে লজ্জা পাই কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে আমরাই অন্যতম শীর্ষস্হান দখল করে আছি। এর কোনও মানে আছে?কতজন নারী পুরুষের বিশাল পার্থক্য এবং দায়িত্ব ভাগ করে না দিয়ে বরং ছেলেমেয়ে সকলকে সমানভাবে মানুষ হিসেবে বড় করছেন?

আমরা সমাজের মেয়েদের লুকিয়ে, পৃথকভাবে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। এতে করে কি ছেলেদের তাদের প্রতি আকর্ষণ ও কৌতুহল আরও বেশি জন্মে না? বাবা মায়ের আদরে বড় করা একটা মেয়ে যখন ধর্ষনের শিকার হয় তখন কি লাভ হয় সেই মেয়েটির সারা জীবন ওড়না পেচিয়ে, মাঠে ঘাটে খেলা বাদ দিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা উৎসর্গ করার?

আর দয়া করে বলবেন না ধর্ষক আওয়ামী- বিএনপি- জামাতী কিংবা সর্বহারা। ধর্ষকের আর কোনও লেবেল থাকতে পারে না, তারা মানসিকভাবে সুস্থ নয়।

পৃথিবীর শীর্ষস্হানীয় প্রায় প্রতিটি দেশেই নগ্ন সৈকত রয়েছে যেখানে নারী পুরুষ বিবস্ত্র হয়ে থাকেন। আমার বর্তমান শহরে আজ পর্যন্ত একটি ধর্ষনের ঘটনাও সেখানে ঘটে নি। এ থেকে বোঝা যায়, মেয়েটির পোশাক, অবস্থান, পেশা কিছুই আসলে ব্যাপার নয়। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে শিক্ষা, জ্ঞান, মনুষ্যত্ব এবং ধর্ম ও আইনের প্রতি সন্মান। আর একটা খুব দামি কথা পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাতেই বিদ্যমান। তা হল-

“নিজের চরকায় তেল দাও।”

আমরা সবাই যদি অন্যের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেদের ত্রুটিগুলো পরিশোধন করতে উদ্বুদ্ধ হই তবে এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হতে পারে।শাস্তির ব্যাবস্থা অবশ্যই করা উচিত কিন্তু ধর্ষন যেমন মধ্যযুগীয় অসভ্য সময়ের কাজ তেমনই এর শাস্তি যেন আমাদের সেই মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে না যায়।

সমাজ সংস্কারক, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, শিক্ষক এবং এই শ্রেণীর প্রতিটি মানুষকে মুক্ত চিন্তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। ধর্ম এবং ধর্মীয় শিক্ষা একটি উপায় হতে পারে তবে আমাদের দেশে ১০০% কোনও ধর্মই মেনে চলা সম্ভব নয়। কারন সতীদাহও কেউ করবে না আর ২৫ বছরের কোনও যুবক ৪০ বছরের বিধবাকে ভালবেসে বিয়েও করবে না।

তবে হ্যা, এগুলোই যে সমাধান অথবা এগুলো করলেই যে পৃথিবী থেকে ধর্ষন উঠে যাবে তা কিন্তু নয়। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোতেও ধর্ষন হয় তবে সেখানে বিচার, নৃশংসতা এবং বিশেষ করে ধর্ষিতার জীবন একেবারেই অন্যরকম। কিন্তু এই কথাগুলো মানলে আমাদের দেশে ধর্ষনের সংখ্যাটা কমবে এবং নিরপত্তাটা হয়ত বাড়বে।

এগুলো কিন্তু কেবল আমার মনের চিন্তা। কোনও রিসার্চ করা তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধ নয়। তাই ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধরে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। বিভিন্ন কারনে আমি নিজেকে নারী হিসেবে পরিচয় দিই না। যখন অন্য একজন মানুষের সামনে আসি তখন এটা নিয়ে মাথা ব্যাথা করি না যে সে নারী,শিখন্ডী,উভয়লিঙ্গ, বৃহন্নলা নাকি পুরুষ। আমি অন্যকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করি এবং চাই সবাই আমাকে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন করুক।

আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে এমন বাবুদের আশেপাশে বাস করি যারা শুধু প্রাণী কেন, গাছ, পাতা, ফুল, ফল, প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষ সকলের প্রতিই ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব পোষন করে। তারা হয়ত মুরুব্বী দেখলেই বিশাল সালাম ঠোকে না, কিংবা অনাত্মীয়কে শুধুমাত্র বয়সে বড় বলে হঠাৎ আঙ্কেল বলে ডাকে না, কিন্তু আমি হলফ করে বলে দিতে পারি এই বাবুগুলোর একজনও ইচ্ছা করে একটা প্রজাপতির ডানা ভেঙে দিবে না। আর এমন প্রায় এক হাজার বাবু যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে তাদের সান্নিধ্যে এসেছি নানা কারনে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আহারে আমাদের দেশের বাচ্চাগুলো, বিশেষ করে ছেলেবাচ্চাগুলো কতইনা অভাগা। মেয়েগুলো তো তাও বোধশক্তি দিয়ে বিচার করে মানুষ হিসেবেই নিজেদের পরিনতি মেনে নেয় কিংবা মৃত্যুবরণ করে। ছেলেগুলো তো জানতেই পারে না ।

সৃষ্টিকর্তার এই অসম্ভব সুন্দর পৃথিবীর সবচেয়ে অবাক করা মায়াময় বিষয়গুলোই তাদের কাছে অধরা থেকে যায়।

 

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles