
অন্টারিও প্রদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এক নজিরবিহীন আর্থিক সংকটে পড়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সর্বশেষ সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রদেশের কলেজগুলো ২০২৪ সালে প্রায় ৭৫২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী সেবা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
গত এক দশক ধরে অন্টারিওর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বর্তমানে প্রদেশে প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে, যার মধ্যে ২ লাখ ৮০ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। তবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির হার প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে। এ অবস্থার পেছনে সরকারের নতুন ভিসা নীতি, নীতি পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অন্টারিও কলেজগুলোর আয়ের একটি বড় উৎস। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী বছরে গড়ে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ডলার টিউশন ফি প্রদান করে, যেখানে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা দেয় মাত্র ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ ডলার। এই বিশাল পার্থক্য কলেজগুলোকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর অত্যাধিক নির্ভরশীল করে তুলেছে। ভর্তি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেটে ঘাটতি দেখা দেয় এবং অর্থনৈতিক চাপ বেড়ে যায়।
সরকারি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রদেশের অন্তত ২২টি কলেজ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিছু কলেজ কর্মী ছাঁটাই এবং খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টরন্টোর একটি বৃহৎ কমিউনিটি কলেজে গত বছর ১৫০ জন পূর্ণকালীন কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরির খাতেও বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
এই সংকট শিক্ষার্থীদের জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করছেন, আগে সহজলভ্য ভাষা প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার সাপোর্ট সেবা এখন সীমিত হয়ে গেছে। কলেজগুলোর আবাসন সুবিধাও সংকুচিত করা হয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা বাজারে মাসে ১২০০–১৫০০ ডলার ভাড়া দিয়ে বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি তাদের টিউশন ফি-র সঙ্গে মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হ্রাসের পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, কানাডা সরকার ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দা দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে পড়াশোনা ব্যয়বহুল করেছে। তৃতীয়ত, আবাসন সংকট বড় শহরগুলোকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কম আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
প্রাদেশিক সরকার জানিয়েছে, কলেজগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছে, কলেজগুলোকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ বাড়াতে নতুন বৃত্তি কর্মসূচি চালু হবে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদে অন্টারিওকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ শিক্ষার্থী ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমানে প্রদেশের মোট শিক্ষা বাজেটের প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ফি থেকে, যা অত্যধিক।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোও দাবি করেছে, কলেজগুলোকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি পরিবর্তন করতে হবে। এক শিক্ষার্থী সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন, “আমরা উচ্চ ফি দিচ্ছি, অথচ সেবা কমছে। এটি অন্যায্য।”
সব মিলিয়ে, অন্টারিও কলেজের এই আর্থিক সংকট শুধু শিক্ষা খাত নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সম্প্রদায়ের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি সঠিক সময়ে সমাধান না নেওয়া হয়, তবে প্রদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের সুনাম ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

