কানাডা জীবনের শুরুর গল্প

কানাডা জীবনের শুরুর গল্প - the Bengali Times
সৈয়দ আযম

কানাডার জীবনের শুরুর দিকের কথা । অড জব করতে করতে ৩ বছর পার হয়ে গেল।  চিটাগাং মেডিকেল থেকে পাশ করা একজন ডাক্তার বড় ভাই ছিলেন বন্ধুর মতো। যখন দেখা হতো একসাথে বসে কফি খেতাম কথা বলতাম। তার উপদেশ মতো একদিন ভর্তি হলাম টরন্টোর এক কলেজে ২ বছর মেয়াদী Health Information Management  কোর্সে।

২ বছর পর কোর্স শেষে চাকরীর বাজারে এসে হোঁচট খেতে হলো। একটির পর একটি হাসপাতালে ইন্টারভিউ দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু কিছুই হচ্ছেনা। বড় সমস্যা হলো এ চাকুরীর আমার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। অনেকটা হতাশ হয়ে আবারও অড জব খোঁজা শুরু করলাম। একদিন G4S কোম্পানীর এক ম্যানেজারের ফোন পেলাম। তিনি বলছেন-তোমাকে একটু দেখতে চাই।

- Advertisement -

এ কোম্পানীতে একটি জবের জন্য লিখিত পরীক্ষা দেই সে সময়ে বেশ কিছু দিন আগে। বুঝতে পারলাম সে কারনেই আমাকে ডেকেছে। হাজির হলাম। একজন নারী ম্যানেজার আমার সাথে কথা বলছেন।

-তোমার সাথে দেখা করার জন্য ডেকেছি।

-কেন?

আমি জানতে চাইলাম।

-কারন লিখিত পরীক্ষায় তুমি যে নম্বর পেয়েছো তা কেউ  সচরাচর পায়না তাই।

-কত?

-৯৬

একটু সাবধান হলাম কথা কম বলা শুরু করলাম কারন আমার আসল পরিচয় পেলে এই অড জবটিও আমাকে দেবেনা over qualified দেখিয়ে।

-তা কি শুধু দেখার জন্য ডেকেছো চাকরী দেবেনা?

-হ্যা তাও দেব কিন্তু তুমিতো শুধু  গার্ডের চাকরী চেয়েছো। তুমি সুপারভাইজারের চাকরী করার জন্য উপযুক্ত।

আমার হাতে পয়সা কড়ি নেই যেমন তেমন একটি চাকরীর দরকার মাত্র তাই বললাম-

-আপাতত গার্ডের চাকরী দাও, পরে দেখা যাবে।

একটি কম্পাউন্ডে ৩টি হাই রাইজিং বিল্ডিং এ সপ্তাহে ৩ দিন বিকাল ৫টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কাজটি আধা পুলিশের। একটি ওয়াকিটকি হাতে পুরা রাতটাই হেঁটে বেড়াতে হয় পারকিং থেকে কম্পাউন্ড সব স্থানে। প্রয়োজনে ওয়াকিটকিতে তথ্য আদান প্রদান করতে হয়।

প্রতিদিন বিকালে ছোট্ট একটি চাইনিজ ছেলে তার মায়ের সাথে বাসায় ফেরে আমার ডিউটিষ্টেশনের সামনে দিয়ে। দু’একদিন চোখাচোখি হওয়ার পর সে আমাকে দেখে মিটি মিটি হাসে। হাত ইশারা দেয়। আমি একদিন দুটি চকলেট দিলাম তাকে। সে খুশী মনে তার মায়ের সাথে চলে গেল।

এখন সে প্রতিদিন যাওয়ার পথে দৌড়ে চলে আসে মায়ের বাধা উপেক্ষা করে। আমার টেবিলের ড্রয়ারটা খুলে ফেলে চকলেট খোঁজে। তার জন্য চকরেট রাখি নিয়মিত।। তার মাকে একদিন বল্লাম-কিছু মনে করোনা আমারও একটি ছেলে আছে। ছেলেটির নাম লিও।

একদিন লিও চাইনিজ ভাষায় তার মাকে আমাকে দেখিয়ে দুর থেকে বলছে

-শুশু

আবার কি বলে? ভাবলাম।

-আচ্ছা তোমার ছেলে শুশু বলে কি বলছে?

মনে হলো তার মা একটু ভয় পেল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো-শুশু মানে চাচা, সে তোমাকে চাচা বলে।

লিওর সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ক্রিসমাস ডেতে আমার জন্য দেখি সে উপহার নিয়ে এসেছে।

এর মধ্যেই টরন্টো পুলিশের দপ্তর থেকে ১২ ঘন্টার ট্রেনিং নিয়ে এলাম Parking Enforcement এর উপর। রাতের বেলায় এই কম্পাইন্ডে অনেকে পারমিট ছাড়াই গাড়ী পার্ক করে রাখে সেগুলি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয় এবং ফাইনের টিকেট লাগাতে হয়। এটা রাত ৩টার সময় করতে হয়।

একদিন রাতে checking এ বের হয়েছি। প্রথমেই একটি গাড়ীর কাছে এসে থমকে দাঁড়ালাম। পেছনের সীটে একটি বেবি সিট। মনে হলো লিওর মায়ের গাড়ী। কোন পারকিং পারমিট ছাড়াই সে গাড়ীটি বাইরে পার্ক করেছে। টিকেট দেব কি লিওর কথাতো মনে পড়ে। টিকেট দিলাম না। ভাবনায় এলো অন্য গাড়ীতে টিকেট দিলে লিওদের গাড়ীতে টিকেট না থাকার কারনটিও উঠে আসতে পারে। আমার কাজটি সে ক্ষেত্রে অসৎ মনে হতে পারে। সিদ্ধান্ত নিলাম আজ আর কোন গাড়ীতে টিকেট দেবনা। সকালে জানতে চাইলে বলবো রাতে সময় পাইনি।

বেশ কিছু দিন পর লিওর মায়ের সাথে দেখা।

-তুমি গাড়ী বাইরে রাখো কেন?

সে আমার কথার উত্তর না দিয়ে বললো-

-সে দিন আমার গাড়ী বাইরে রেখেছিলাম ভুলে অথচ আমাকে কেউ টিকেট দেয়নি। আমি বাবার কাছে বললাম। বাবা তোমার কথা বললো

-দেখগে ঐ লোকটি সেদিন ডিউটিতে ছিলো তাই টিকেট দেইনি।

-তোমার বাবাতো ঠিকিই বুঝেছে।

বুঝলাম লিওর নানাও আমার কথা জানে । হয়তো লিও তার কাছে আমার গল্প বলে।

লিও ইংরাজী বলেনা, বুঝেওনা। স্কুলে যাওয়ার বয়স তার এখনো হয়নি। আমি চাইনিজ ভাষাও বুঝিনা তবুও সে আমার কাছে আসে, পাশে এসে দাঁড়ায় চকলেট নিয়ে চলে যায়। মায়া মমতা, ভালোবাসা বোঝার জন্য হয়তো কোন ভাষা লাগেনা তাই লিওর দুষ্টুমীভরা হাসি মুখ নিয়ে আমার কাছে আসা যাওয়া।

ইয়েলোনাইফ, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles