
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বরের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে এক নববধূকে তুলে নেওয়ার অভিযোগের ঘটনায় নতুন মোড় এসেছে। তামান্না আক্তার নামে ওই নববধূ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, তাকে কেউ অপহরণ করেনি। বরং দীর্ঘদিনের প্রেমিক আতিকুর রহমান মিয়াদের সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছায় চলে গেছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিও বার্তায় এ দাবি করেন তামান্না। এর আগে রোববার (৩০ আগস্ট) রাতে উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের হাজিপুর বাজার এলাকায় বরের মাইক্রোবাস থামিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ভিডিও বার্তায় তামান্না জানান, আতিকুরের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পারিবারিকভাবে তাদের সম্পর্ক মেনে না নেওয়ায় তারা একসঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমি যেমনেই আইছি, জোর কইরা হউক, নিজের ইচ্ছায় হউক, যেমনেই হউক। আইছিতো আইছিই। এহন যদি যাইগাও, গেলেও তো আমার মান-সম্মান ফিরা আইতো না, আমার বাপ-মার মান-সম্মানও ফিরা আইতো না। গেইলেও কোনো লাভ নাই। আমি আইছি, এনেই থাকবাম।’
তবে তামান্না বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন এবং তাকে সত্যিই স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে নাকি জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কী ঘটেছিল সেদিন?
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার আবুল মিয়ার মেয়ে তামান্না আক্তারের সঙ্গে নান্দাইল উপজেলার রাজাবাড়িয়া গ্রামের আক্তার মিয়ার বিয়ে হয়।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বর ও বরযাত্রীরা নববধূকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। পথে জিনারী ইউনিয়নের হাজিপুর বাজার এলাকায় পৌঁছালে একদল যুবক গাড়িটির গতিরোধ করে বলে অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০ থেকে ২৫ জন যুবক গাড়িটি থামিয়ে ভাঙচুর করেন। পরে নববধূকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় বরযাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।
বরের পরিবারের পক্ষ থেকে হোসেনপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সামনে এলো পুরোনো প্রেমের সম্পর্ক
ঘটনার পর তামান্না ও আতিকুর রহমান মিয়াদের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তাদের মধ্যে আগে থেকেই প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
অভিযুক্ত আতিকুর হোসেনপুর উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের চর হাজিপুর গ্রামের মজিবুরের ছেলে। তিনি ছাত্রদলের কর্মী বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার পর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আতিকুর লিখেছেন, ‘জীবনে আর কিছু চাওয়ার নাই..!’
তবে ঘটনার বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরও ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে।
দলীয় পরিচয় নিয়ে যা বলছে ছাত্রদল
হোসেনপুর উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব দেলোয়ার হোসেন রাজীব বলেন, আতিকুর রহমান মিয়াদ ছাত্রদলের কর্মী।
জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাফিউল ইসলাম নওসাদ বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আতিকুর সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী। তবে মেয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শরীফুল ইসলাম নিশাদ বলেন, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন। আতিকুর ছাত্রদলের সমর্থক হলেও কোনো দলীয় পদে নেই। ফলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সীমিত।
তদন্ত করছে পুলিশ
হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। কারা গাড়িটি থামিয়েছিল, নববধূকে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ কী—এসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তামান্নার ভিডিও বার্তার পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ ও পুলিশের তদন্তের ফল কতটা মেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

