নায়াগ্রা ফলসে অনাহূত বোধ করছেন তারা

নায়াগ্রা ফলসে অনাহূত বোধ করছেন তারা - the Bengali Times
কানাডার অন্টারিও প্রদেশের জনপ্রিয় পর্যটন নগরী নায়াগ্রা ফলসে আশ্রয় নেওয়া কাশেচুয়ান ফার্স্ট নেশনের বাসিন্দাদের নিয়ে সিটি কাউন্সিলে করা এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের জনপ্রিয় পর্যটন নগরী নায়াগ্রা ফলসে আশ্রয় নেওয়া কাশেচুয়ান ফার্স্ট নেশনের বাসিন্দাদের নিয়ে সিটি কাউন্সিলে করা এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আদিবাসী নেতাদের অভিযোগ, ওই মন্তব্য শুধু বাস্তুচ্যুত মানুষদেরই অপমান করেনি, বরং গত জানুয়ারি থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে নায়াগ্রা ফলসে বসবাসরত শত শত মানুষের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা ও অনাহূত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করেছে।

নিশনাওবি আস্কি নেশনের গ্র্যান্ড চিফ আলভিন ফিডলার এক বিবৃতিতে বলেন, গত ২৩ জুলাই নায়াগ্রা ফলস সিটি কাউন্সিলের বৈঠকে গৃহহীনতা পরিস্থিতি নিয়ে একটি উপস্থাপনার সময় যে মন্তব্য করা হয়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষায়, ওই বক্তব্যে এমন একটি ধারণা উঠে এসেছে যে, নগর কর্তৃপক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে শহরের পর্যটননির্ভর ভাবমূর্তি রক্ষা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।

- Advertisement -

ফিডলার আরও বলেন, নায়াগ্রা ফলসের মেয়র জিম ডিওডাটি এবং সাবেক প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা কেন টডের মন্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, শহরের বিভিন্ন স্থানে যদি বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত আদিবাসী মানুষকে প্রকাশ্যে দেখা যায়, তাহলে নায়াগ্রা ফলস তার পর্যটন আকর্ষণ হারাতে পারে। তাঁর মতে, এই ধরনের বক্তব্য শুধু সংবেদনশীলতার অভাবই প্রকাশ করে না, বরং একটি সংকটাপন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাবও তুলে ধরে।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত জানুয়ারিতে যখন কাশেচুয়ান ফার্স্ট নেশনের শত শত বাসিন্দাকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে এনে নায়াগ্রা ফলসের খালি হোটেলগুলোতে রাখা হয়েছিল, তখন শহরের ভাবমূর্তি নিয়ে এমন কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই মানুষগুলোকেই এখন শহরের জন্য সমস্যা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে—যা অত্যন্ত হতাশাজনক।

চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি কাশেচুয়ান ফার্স্ট নেশনের প্রধান হোসেয়া ওয়েসলি ও স্থানীয় কাউন্সিল জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিনের পুরোনো পানি সরবরাহ অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বর্জ্যের পানিতে কমিউনিটির নার্সিং স্টেশন প্লাবিত হয়ে পড়ে। এতে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ায় মাত্র দুই দিনের মধ্যে শত শত বাসিন্দাকে কমিউনিটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সরিয়ে নেওয়া পরিবারগুলোর একটি বড় অংশকে অন্টারিওর বিভিন্ন শহরে অস্থায়ীভাবে রাখা হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে নায়াগ্রা ফলসের হোটেলগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তারা গত প্রায় ছয় মাস ধরে বসবাস করছেন।

সিটি কাউন্সিলে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কাশেচুয়ান ও অন্যান্য এলাকা থেকে সরিয়ে আনা প্রায় ১,১০০ থেকে ১,৭০০ জন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি নায়াগ্রা ফলসে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজ নিজ কমিউনিটিতে ফিরতে না পারায় তাদের অনেকেই মানসিক চাপ, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে শহরের একজন সাবেক শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তার এমন মন্তব্য বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর মধ্যে আরও হতাশা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন আদিবাসী নেতারা।

বিতর্কিত মন্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কেন টড নায়াগ্রা ফলসের সাবেক প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা। গত শরতে শহরের গৃহহীনতা সংকট মোকাবিলায় একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা উপস্থাপনের সময়ই তিনি এমন মন্তব্য করেন বলে জানা গেছে। গৃহহীনতা ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা মূলত একটি মানবিক ও সামাজিক সংকট। এ ধরনের বিষয়কে পর্যটন বা নগরীর ব্র্যান্ড ইমেজের সঙ্গে তুলনা করা সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, বরং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাবকে আরও উসকে দিতে পারে।

গ্র্যান্ড চিফ আলভিন ফিডলার সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষদের বোঝা হিসেবে নয়, বরং দুর্যোগের শিকার নাগরিক হিসেবে দেখা উচিত। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্ব। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নায়াগ্রা ফলসের স্থানীয় নেতৃত্ব ভবিষ্যতে এমন বক্তব্য থেকে বিরত থাকবে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর প্রতি আরও সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ করবে।

এই ঘটনাটি কেবল একটি মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক নয়; এটি দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। কাশেচুয়ানের বাসিন্দারা নিজেদের ইচ্ছায় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত সংকটের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে তাদের উপস্থিতিকে যদি পর্যটনের জন্য নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত বাস্তুচ্যুত মানুষদের প্রতি সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করা এবং সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া। অন্যদিকে, আদিবাসী নেতাদের বক্তব্যও স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের সময়ে আশ্রয় দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আশ্রয়প্রাপ্ত মানুষদের মর্যাদা ও সম্মান বজায় রাখাও সমানভাবে জরুরি।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles