
মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে ঘিরে আবারও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযুক্ত ইসরায়েলি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কানাডা। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতা রোধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অটোয়া। তবে কানাডার এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে ইসরায়েল, এমনকি দেশটিকে ইহুদিবিদ্বেষকে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগও করেছে তেল আবিব।
কানাডা মঙ্গলবার যে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, সেটি পশ্চিম তীরে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তাদের পঞ্চম দফার পদক্ষেপ। নতুন তালিকায় বসতি নির্মাণ ও সম্প্রসারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির পাশাপাশি পাঁচটি কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন ও খামার গড়ে তোলার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং ভূমি দখল প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
পশ্চিম তীর অঞ্চলটি ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা এবং আরও বহু দেশ মনে করে যে অধিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। গত কয়েক দশকে হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক পশ্চিম তীরে বিভিন্ন বসতি গড়ে তুলেছেন। ইসরায়েল এসব বসতিকে নিরাপত্তা ও ঐতিহাসিক অধিকারের প্রশ্নে বৈধ বলে দাবি করলেও আন্তর্জাতিক মহল তা মানতে নারাজ। কারণ এসব বসতি ক্রমশ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে খণ্ডিত করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে দুর্বল করছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই যুদ্ধের প্রভাব শুধু গাজায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; পশ্চিম তীরেও উত্তেজনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতিদের হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। জমি দখল, বাড়িঘরে হামলা, কৃষিজমি নষ্ট করা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো অভিযোগ ক্রমশ বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই কানাডা দুই বছর আগে প্রথমবারের মতো পশ্চিম তীরের সহিংসতায় জড়িত কিছু ইসরায়েলি বসতির বাসিন্দার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে সেই পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত করা হয়। কানাডার আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল ইসরায়েলের দুই অতি-ডানপন্থী মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। তারা হলেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির। দুই নেতাই পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ, তাদের বক্তব্য ও নীতিগত অবস্থান অনেক সময় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় এবং শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
কানাডা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে “দুই রাষ্ট্র সমাধান”-এর সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রাখা। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে যে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন এই দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের সহাবস্থানই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার ধারাবাহিকভাবে দুই রাষ্ট্র সমাধানের ধারণার বিরোধিতা করে আসছে। তার জোট সরকারের ডানপন্থী অংশ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি উপস্থিতি আরও জোরদার করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কানাডার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডও পশ্চিম তীরে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, অধিকৃত অঞ্চলে বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে।
গাজা যুদ্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরের পরিস্থিতিও এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। যদি বসতি সম্প্রসারণ এবং সহিংসতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের ওপর আরও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কানাডার সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা শুধু কয়েকজন ব্যক্তি বা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; এটি মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা। অটোয়া বোঝাতে চাইছে যে পশ্চিম তীরে চলমান বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল এই পদক্ষেপকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া যখন ইতোমধ্যেই গভীর সংকটে, তখন কানাডার এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল। আগামী দিনে পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এবং দুই রাষ্ট্র সমাধান প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান আরও কঠোর হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

