
কানাডাজুড়ে খাদ্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং বাজারে বড় কর্পোরেট গ্রোসারি চেইনগুলোর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, স্থানীয় উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশ সহজ করা এবং ভোক্তাদের জন্য খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফেডারেল সরকার নতুন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্বাধীন গ্রোসারি ব্যবসায়ী, কৃষক প্রতিনিধি এবং খাদ্য শিল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অংশীজন।
ফেডারেল সরকারের ঘোষিত এই কৌশলের আওতায় আগামী ১০ বছরে ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হবে। সরকারের দাবি, এই বিনিয়োগ দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে, স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করবে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে ভোক্তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম আরও সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সাহায্য করবে।
পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে এমন অবকাঠামো উন্নয়নে, যা স্বাধীন ও ছোট গ্রোসারদের বৃহৎ খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ফুড হাব, আঞ্চলিক খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র এবং ফুড টার্মিনাল নির্মাণ ও আধুনিকায়ন। সরকারের মতে, এসব কেন্দ্র গড়ে উঠলে কৃষক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই তাদের পণ্য ছোট ও স্বাধীন গ্রোসারি দোকানগুলোর কাছে সরাসরি বিক্রি করতে পারবে। এতে সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যবর্তী ধাপ কমে আসবে এবং খাদ্যপণ্য দ্রুত ও কম খরচে বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
একজন গ্রোসারি মালিক জানান,, বর্তমানে ছোট গ্রোসারদের জন্য সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, “অনেক কৃষক বা উৎপাদক তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। ফলে দুধ, ডিমসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমাদের পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে কিনতে হয়।” তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বৃহৎ গ্রোসারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ নেটওয়ার্ক। এর ফলে স্বাধীন ব্যবসায়ীরা প্রায়ই সোবিস কিংবা লবল’র মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করতে বাধ্য হন। “আমরা উৎপাদকদের কাছ থেকে সরাসরি কেনার সুযোগ হারিয়েছি। মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পণ্য কিনতে হয়। এর ফলে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি খরচ করতে হয়,” বলেন ট্রিমার্চি।
সরবরাহ ব্যবস্থায় যত বেশি মধ্যবর্তী স্তর থাকবে, ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম তত বেশি হবে। নতুন ফুড হাব ও টার্মিনাল প্রতিষ্ঠিত হলে উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, সংরক্ষণ খরচ কমবে এবং অপ্রয়োজনীয় কমিশন বা মুনাফার স্তর হ্রাস পাবে। ট্রিমার্চির মতে, “যদি আরও বেশি ফুড হাব ও আঞ্চলিক টার্মিনাল গড়ে তোলা যায়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা অনেকটাই কমে যাবে। এতে পণ্যের দাম আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে এবং ভোক্তারা উন্নত মানের তাজা খাদ্যপণ্য পাবেন।”
নতুন কৌশল শুধু গ্রোসারি ব্যবসায়ীদের নয়, স্থানীয় কৃষক ও খাদ্য উৎপাদকদের জন্যও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে অনেক ছোট কৃষক বড় বিতরণ ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান, ফলে তাদের উৎপাদিত পণ্য বৃহত্তর বাজারে পৌঁছাতে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠলে স্থানীয় কৃষকরা সরাসরি আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। এতে তাদের আয় বাড়বে এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যের প্রাপ্যতাও বৃদ্ধি পাবে। সরকারের লক্ষ্য হলো বছরজুড়ে স্থানীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, যাতে আমদানিনির্ভরতা কিছুটা কমে আসে।
গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কানাডার অনেক পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে সরকার দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হলে স্বাধীন গ্রোসারদের অবস্থান শক্তিশালী হবে, স্থানীয় কৃষকরা বেশি সুবিধা পাবেন এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। তবে এর বাস্তব প্রভাব কতটা দ্রুত দেখা যাবে, তা নির্ভর করবে অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সৃষ্টির ওপর। খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির এই সমন্বিত উদ্যোগকে অনেকেই কানাডার খাদ্য খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন, যা ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক খাদ্য বাজার গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

