স্কুল-পরবর্তী অনুষ্ঠানে হিজাব পরতে পারেননি গ্যাটিনোর এক মা

স্কুল-পরবর্তী অনুষ্ঠানে হিজাব পরতে পারেননি গ্যাটিনোর এক মা - the Bengali Times
কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক নতুন আইনকে কেন্দ্র করে এবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গ্যাটিনো স্কুল বোর্ডের একটি অভিভাবক কমিটি

কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ক নতুন আইনকে কেন্দ্র করে এবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গ্যাটিনো স্কুল বোর্ডের একটি অভিভাবক কমিটি। তাদের আশঙ্কা, আইনটির কঠোর প্রয়োগের ফলে স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী অনেক অভিভাবক নিরুৎসাহিত হতে পারেন, যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

বিতর্কের সূত্রপাত এক মুসলিম মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে। স্থানীয় একটি এলিমেন্টারি স্কুলে পড়ুয়া তার সন্তান বাড়ি ফিরে মাকে জানায়, আসন্ন শরৎকালে স্কুল-পরবর্তী একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাইলে তাকে হিজাব খুলতে হতে পারে। শিশুটির এমন বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ওই মা।

- Advertisement -

গ্যাটিনো স্কুল বোর্ডের প্যারেন্ট কমিটির সভাপতি সিমন লাজোইয়ি বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, স্কুলগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক সংকট ইতোমধ্যেই একটি বড় সমস্যা। এর মধ্যে যদি ধর্মীয় পোশাক পরিধানকারী অভিভাবকেরা নিজেদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে। “আমরা এখনই স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগে নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে এমন বার্তা দেওয়া সত্যিই হতাশাজনক,” বলেন লাজোইয়ি।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লা ড্রোইট প্রথম ঘটনাটি প্রকাশ্যে আনে। তবে সংশ্লিষ্ট মায়ের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে, কারণ তিনি আশঙ্কা করছেন যে প্রকাশ্যে এলে তার সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। রেডিও-কানাডাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাজোইয়ি জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে ঘটনাটি গ্যাটিনোর হাল সেক্টরের একটি স্কুলে ঘটেছে। তবে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও সামাজিক চাপের ভয়ে ওই নারী জনসমক্ষে এ বিষয়ে আর কথা বলতে চান না। জানা গেছে, ওই মা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে স্কুল-পরবর্তী একটি কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, নতুন বিল ৯৪ অনুযায়ী তিনি হিজাব পরে ওই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।

কুইবেক সরকারের পাস করা বিল ৯৪ মূলত প্রদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতিকে আরও বিস্তৃত করেছে। আগে ধর্মীয় প্রতীক বা চিহ্নযুক্ত পোশাক পরিধানে নিষেধাজ্ঞা মূলত শিক্ষক, অধ্যক্ষ এবং কিছু সরকারি দায়িত্বশীল পদে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন সংশোধনের ফলে এখন স্কুলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন এমন আরও বিস্তৃত শ্রেণির ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। আইনটির এমন ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অভিভাবকদের স্কুলের কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে মুসলিম নারীরা, যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে হিজাব পরেন, তারা নিজেদের অবাঞ্ছিত বা বৈষম্যের শিকার বলে মনে করতে পারেন। অন্যদিকে, আইনটির সমর্থকেরা বলছেন, কুইবেকের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় প্রভাব থেকে সরকারি সেবাগুলোকে পৃথক রাখা। তবে বাস্তবে এই নীতির প্রয়োগ কতটা দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট স্কুল সার্ভিস সেন্টার সিএসএসপিও গণমাধ্যম সিবিসি-কে কোনো সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ঘটনাটির প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়।

এই ঘটনা কেবল একজন মায়ের অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি কুইবেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলগুলোতে অভিভাবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি কোনো আইন বা নীতির কারণে অভিভাবকদের একটি অংশ নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করেন, তাহলে তার প্রভাব শুধু পরিবার নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপরই পড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্কের পর কুইবেক সরকার বা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইনটির প্রয়োগ নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেয় কি না এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় কি না।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles