
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সেফ প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তির বাস্তব সুফল দেখা যেতে শুরু করেছে। চুক্তির আওতায় প্রথম কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ পেয়েছে মন্ট্রিয়লভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি মারকোনি টেকনোলজিস। ফ্রান্সের এভিয়ানে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এ ঘোষণা দিয়ে বলেন, ইউরোপ ও কানাডার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন যুগের সূচনা হয়েছে।
সোমবার ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টনিও কস্তার সঙ্গে বৈঠকের আগে কার্নি জানান, পোল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর জন্য কানাডায় তৈরি কৌশলগত রেডিও সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে মারকোনি টেকনোলজিস। এই প্রকল্পের মূল্য এক কোটি ডলারেরও বেশি। প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, “এটি কেবল শুরু। এর পর আরও অনেক সুযোগ আসবে। আমরা একসঙ্গে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং এই অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিতে পেরে আমি আনন্দিত।”
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মারকোনি টেকনোলজিস পোল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ইনামোর ইন্টারন্যাশনাল-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে। এই অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পোলিশ সামরিক বাহিনীকে আধুনিক কৌশলগত যোগাযোগ ব্যবস্থা সরবরাহ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় উন্নতমানের সামরিক রেডিও সরবরাহ করা হবে, যা যুদ্ধক্ষেত্র ও সামরিক অভিযানে নিরাপদ এবং দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। চলতি বছর থেকেই সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ইউরোপীয় দেশগুলোর অন্যতম অগ্রাধিকার। ফলে এই চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বড় প্রকল্পের দরজা খুলে দিতে পারে।
সেফ বা সিকিউরিটি অ্যাকশান ফর ইউরোপ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বৃহৎ প্রতিরক্ষা অর্থায়ন কর্মসূচি। এর মোট আকার প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ইউরো (১৫ হাজার কোটি ইউরো)। কর্মসূচিটির লক্ষ্য হলো ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা। এছাড়া ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর যে নির্ভরশীলতা বজায় রেখেছে, তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার কৌশলগত পরিকল্পনারও অংশ এই উদ্যোগ। সেফ-এর আওতায় অংশগ্রহণকারী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার এবং তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়নের সুবিধা পায়। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
সেফ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ইউরোপের বাইরের একমাত্র দেশ বর্তমানে কানাডা। গত মে মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কানাডার অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায় এবং জুন মাসে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। ব্রাসেলস সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর ফলে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রতিরক্ষা ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে এবং সেফ তহবিলের সুবিধাও গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। এটি কানাডার প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অর্জন। কারণ ইউরোপের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ এতদিন কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর জন্য সীমিত ছিল।
তবে চুক্তিটি নিয়ে সব মহল একমত নয়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেফ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য কানাডাকে প্রায় এক কোটি ইউরো বা প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ কানাডিয়ান ডলার ফি দিতে হয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, এই বিনিয়োগের বিপরীতে কানাডা কতটা অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। তাদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ অবশ্যই ইতিবাচক, তবে দীর্ঘমেয়াদে কতগুলো প্রকল্প কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো অর্জন করতে পারে সেটিই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, মারকোনি টেকনোলজিসের এই প্রথম চুক্তিই প্রমাণ করছে যে সেফ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ভবিষ্যতে আরও কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হলে দেশটির প্রযুক্তি খাত ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্ব রাজনীতিতে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বর্তমানে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে ইউরোপ ও কানাডার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মারকোনি টেকনোলজিসের এই চুক্তিকে তাই কেবল একটি ব্যবসায়িক সাফল্য হিসেবে নয়, বরং কানাডা-ইইউ প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে সেফ কর্মসূচির মাধ্যমে আরও বড় প্রকল্পে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়লে দুই পক্ষের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

