
কুইবেকের মন্ট্রিয়ল মহানগরীর সাউথ শোর অঞ্চলের জন্য সোমবার ছিল একটি ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেন্ট-হুবার্ট বিমানবন্দরে (বর্তমানে মন্ট্রিয়ল মেট্রোপলিটান এয়ারপোর্ট নামে পরিচিত) পোর্টার এয়ারলাইন্সের নতুন বাণিজ্যিক যাত্রী টার্মিনাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। এর মাধ্যমে মন্ট্রিয়লের দক্ষিণাঞ্চল প্রথমবারের মতো কানাডার বিভিন্ন প্রধান শহরের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগের একটি নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
দীর্ঘদিন ধরে পাইলট প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত বিমান চলাচল এবং কার্গো পরিবহনের জন্য পরিচিত সেন্ট-হুবার্ট বিমানবন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রীবাহী বিমানবন্দরে রূপান্তর করা হয়েছে। নতুন টার্মিনাল থেকে প্রাথমিকভাবে কানাডার ১১টি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করবে পোর্টার এয়ারলাইন্স। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যানকুভার, ক্যালগেরি, এডমন্টন এবং টরন্টোর মতো দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পোর্টার এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল ডেলুস এই উদ্যোগকে কেবল একটি নতুন টার্মিনাল চালুর ঘটনা হিসেবে নয়, বরং কুইবেকের বিমান পরিবহন শিল্পের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “যখন একটি অঞ্চলে বিমান যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়, তখন শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ে। আমরা বিশ্বাস করি, এই বিমানবন্দর মন্ট্রিয়ল-ট্রুডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবে।” ডেলুসের মতে, মন্ট্রিয়ল অঞ্চলে দুটি বিমানবন্দরে পোর্টারের উপস্থিতি ভ্রমণকারীদের জন্য আরও বেশি নমনীয়তা ও সুবিধা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে এটি কুইবেক ও কানাডার অন্যান্য প্রদেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
পোর্টার এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, নতুন সেবার জন্য যাত্রীদের আগ্রহ তাদের পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। উদ্বোধনের আগেই বিভিন্ন রুটে টিকিট বুকিংয়ের হার প্রত্যাশার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। মাইকেল ডেলুস জানান, “জুলাই মাসের মধ্যেই আসন সংখ্যা এবং পরিচালিত ফ্লাইটের পরিমাণের বিচারে মন্ট্রিয়ল মেট্রোপলিটান এয়ারপোর্ট আমাদের নেটওয়ার্কের চতুর্থ বৃহত্তম বিমানবন্দরে পরিণত হবে বলে আমরা আশা করছি।” এটি শুধু পোর্টার এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ নয়; বরং মন্ট্রিয়ল অঞ্চলের বিমান চলাচলের কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের প্রায় সম্পূর্ণভাবে ট্রুডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন এই বিকল্প সেই চাপও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
ডাউনটাউন মন্ট্রিয়ল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেন্ট-হুবার্ট বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এটি কুইবেকের বিমান চলাচল ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে এতদিন এটি মূলত প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত বিমান এবং কার্গো পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হতো। নতুন যাত্রী টার্মিনাল চালুর ফলে বিমানবন্দরটির ভূমিকা এখন সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। লঙ্গুইউইলের মেয়র ক্যাথেরিন ফোর্নিয়ের বলেন, “এটি শুধু একটি বিমানবন্দর প্রকল্প নয়। এটি কুইবেক এবং কানাডার বাকি অংশের সঙ্গে আমাদের সংযোগকে আরও শক্তিশালী করার একটি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ।” তিনি আরও বলেন, এই উন্নয়ন সাউথ শোর অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন টার্মিনাল চালুর ফলে মন্ট্রিয়লের সাউথ শোর অঞ্চলে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে। দ্রুত ও সহজ বিমান যোগাযোগের কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের অন্যান্য বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে সংযুক্ত হতে পারবে। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্পও লাভবান হবে। কানাডার পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের শহরগুলো থেকে পর্যটকদের জন্য মন্ট্রিয়ল ও আশপাশের অঞ্চলে পৌঁছানো আরও সহজ হবে। ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং খুচরা ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পোর্টার এয়ারলাইন্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেন্ট-হুবার্ট বা মন্ট্রিয়ল মেট্রোপলিটান এয়ারপোর্ট ভবিষ্যতে তাদের নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। নতুন টার্মিনালের মাধ্যমে শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, বরং পুরো সাউথ শোর অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সোমবারের উদ্বোধন তাই কেবল একটি বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল চালুর ঘটনা নয়; এটি মন্ট্রিয়লের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য কানাডার বিস্তৃত আকাশপথে আরও শক্তিশালী উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

