
কানাডার অর্থনীতিতে ধারাবাহিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন কনজারভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভর। অর্থনৈতিক সংকোচনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান প্রকাশের পর তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই জবাবদিহি করতে হবে। তবে ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি এই সমালোচনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নাটক বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে কানাডার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ০.১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এর আগে গত প্রান্তিকেও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল। ফলে টানা দুই প্রান্তিক সংকোচনের কারণে অর্থনীতিকে প্রযুক্তিগতভাবে ‘মন্দা’ বা রিসেশনের আওতায় ফেলা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে দেখার পক্ষপাতী নন। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছুটা মন্থরতা থাকলেও তা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যাকে গভীর ও ব্যাপক রিসেশন বলা যায়। শ্রমবাজার, ভোক্তা ব্যয় এবং শিল্পোৎপাদনের বিভিন্ন সূচক এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
সোমবার পার্লামেন্ট হিলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পয়লিয়েভর বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটকে শুধুমাত্র পরিসংখ্যানগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান অবনতির মধ্য দিয়েই প্রকৃত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, “এটি কোনো কৃত্রিম বা কাগুজে মন্দা নয়। দেশে দেউলিয়াত্বের হার বাড়ছে, আরও বেশি মানুষ ফুড ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এসবই প্রমাণ করে যে গত এক বছরে কানাডিয়ানদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়েছে।” কনজারভেটিভ নেতার প্রশ্ন, বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনৈতিক জোট জি-৭-এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কেন শুধুমাত্র কানাডার অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে। তার মতে, এই প্রশ্নের উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে এবং সরকারকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই সোমবার অটোয়ার একটি নির্মাণ প্রকল্প পরিদর্শনে যান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। একই সময়ে তিনি পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত ছিলেন না। এই অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করেও সমালোচনা করেন পয়লিয়েভর। তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর সংসদে উপস্থিত থেকে অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জবাব দেওয়া উচিত ছিল। কানাডিয়ানদের উদ্বেগের বিষয়ে সরাসরি উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে তিনি প্রশ্নোত্তর পর্বে অনুপস্থিত ছিলেন।” বিরোধী দলের অভিযোগ, অর্থনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে জরুরি বিতর্ক আয়োজনের দাবি জানিয়েছিল কনজারভেটিভ পার্টি। তবে স্পিকার ফ্রান্সিস স্কারপালেগিয়া সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে অর্থনৈতিক সংকোচন নিয়ে তাৎক্ষণিক সংসদীয় আলোচনার সম্ভাবনা আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। বিরোধীরা এটিকে হতাশাজনক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেও সরকারপক্ষের মতে, নিয়ম অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পয়লিয়েভরের অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি অর্থমন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ-ফিলিপ শ্যাম্পেইনের দপ্তরে পাঠানো হয়। অর্থমন্ত্রীর প্রেস সেক্রেটারি জন ফ্রাগোস বর্তমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার জন্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংকট কানাডার অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করেছে। সরকারের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ নীতির ফল নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাও এর বড় কারণ।
কানাডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি আগামী কয়েক মাসে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং ভোক্তাদের আর্থিক চাপ ইতোমধ্যেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করবে, অন্যদিকে সরকার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে সামনে এনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে। ফলে অর্থনীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যদিও টানা দুই প্রান্তিকের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি প্রযুক্তিগতভাবে মন্দার ইঙ্গিত দেয়, তবুও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ এখনই গভীর অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছেন না। তবে আগামী কয়েক মাসে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি এবং ভোক্তা ব্যয়ের প্রবণতা কোন দিকে যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে কানাডার অর্থনীতি সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে উঠবে, নাকি আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট অর্থনীতি এখন শুধু অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি কানাডার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে।

