
ডায়াবেটিস, এপিলেপ্সি, গুরুতর অ্যালার্জি এবং অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে অন্টারিও সরকার। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনগুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তাদের মতে, স্কুলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা জোরদারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
অন্টারিওর বাসিন্দা অ্যামি ম্যাককুয়াইড দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তার ছেলে চার্লি নিয়ন্ত্রণহীন এপিলেপ্সিতে আক্রান্ত। চলতি বছর সে সিনিয়র কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয়েছে। সন্তানের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ম্যাককুয়াইড স্কুল ব্যবস্থার বিভিন্ন নীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেখানে বেশ কিছু গুরুতর সীমাবদ্ধতা খুঁজে পান। তার ভাষায়, স্বাস্থ্যগত জটিলতায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় যত্ন, পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সহায়তার ক্ষেত্রে স্কুলগুলোর মধ্যে একরকম নীতি বা মানদণ্ড ছিল না। ফলে একেকটি স্কুলে একেক ধরনের ব্যবস্থা দেখা যায়, যা শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ‘সেফ অ্যাট স্কুল অন্টারিও’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেন। সংগঠনটির মূল লক্ষ্য ছিল স্কুলে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ম্যাককুয়াইড বলেন, “অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতদিন শুধু সুপারিশের পর্যায়ে ছিল। এখন সেগুলোকে বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে প্রদেশ একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় থাকা শিশুদের জন্য আরও স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য এবং সমন্বিত সুরক্ষা কাঠামো তৈরি হবে।”
প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় অন্টারিওর সব স্কুল বোর্ডকে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অভিন্ন পরিচর্যা পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন বোর্ড ও স্কুলে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি চালু থাকলেও নতুন ব্যবস্থায় পুরো প্রদেশজুড়ে একই ধরনের ফরম ও নির্দেশিকা ব্যবহার করা হবে। এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী স্কুল পরিবর্তন করলেও তার স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা একই কাঠামোর মধ্যে থাকবে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছাবে। শুধু শ্রেণিকক্ষেই নয়, শিক্ষার্থীরা যখন স্কুল বাসে যাতায়াত করবে বা শিক্ষাসফর-এ অংশ নেবে, তখনও যেন সেই পরিচর্যা পরিকল্পনা কার্যকর থাকে তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জরুরি পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এবং কী ধরনের চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন এসব বিষয়ে আগে থেকেই স্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে।
নতুন প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্কুলের কর্মীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষক, সহকারী কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অন্যান্য স্টাফদের স্বাস্থ্যগত জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এপিলেপ্সির খিঁচুনি, তীব্র অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া বা অ্যাজমার আকস্মিক আক্রমণের মতো পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েক মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
কানাডাজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন এমন স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে স্কুলে যায়, যেগুলোর জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বা জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় স্কুলগুলোর মধ্যে নীতিগত অসামঞ্জস্য, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অভিভাবক সংগঠনগুলোর দাবি, শিশুদের শিক্ষার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি স্কুলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। নতুন প্রস্তাব সেই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্টারিও সরকার বর্তমানে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো নিয়ে জনমত সংগ্রহ করছে। আগ্রহী ব্যক্তি, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত তাদের মতামত জমা দিতে পারবেন। জনপরামর্শ শেষে প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত রূপ পেলে অন্টারিওর শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি অন্যান্য প্রদেশের জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

