বাজেট বক্তৃতার জন্য ১২ হাজার ডলার পরিশোধ অর্থমন্ত্রীর

বাজেট বক্তৃতার জন্য ১২ হাজার ডলার পরিশোধ অর্থমন্ত্রীর - the Bengali Times
অর্থমন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ ফিলিপ শ্যাম্পেইন

কানাডা সরকার একদিকে ব্যয় সংকোচনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজের জন্য বাইরের ঠিকাদার নিয়োগের প্রবণতা কমছে না এমন অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি নথিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ফেডারেল বাজেট বক্তৃতা প্রস্তুতের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বাইরের একজন পরামর্শক বা ঠিকাদারের সহায়তা নিয়েছিল। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহল ও করদাতা সংগঠনগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাসোয়াঁ-ফিলিপ শ্যাম্পেইন হাউস অব কমন্সে যে বাজেট বক্তৃতা উপস্থাপন করেন, সেটি তার রাজনৈতিক স্টাফ কিংবা সরকারি আমলাদের কেউ লেখেননি। পুরো বক্তৃতাটি প্রস্তুত করেন একজন বাইরের ঠিকাদার। প্রায় এক ঘণ্টার এই বক্তৃতা লেখার জন্য তাকে পরিশোধ করা হয়েছে ১২ হাজার ১৬৮ ডলার।

- Advertisement -

এই তথ্য প্রকাশের পর সরকারে ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে করদাতা অধিকারবিষয়ক সংগঠন কানাডিয়ান ট্যাক্সপেয়ারর্স ফেডারেশন। সংগঠনটির ফেডারেল পরিচালক ফ্রাঙ্কো টেরাজানো তীব্র সমালোচনা করে বলেন, হিসাব করলে প্রতি মিনিটের বক্তৃতা লেখায় খরচ হয়েছে প্রায় ২০০ ডলার। তার ভাষায়, “সরকারি যোগাযোগ কর্মকর্তারা যদি নিজেদের কাজ নিজেরা করতে না পারেন এবং বাইরের সহায়তা নিতে হয়, তাহলে করদাতাদের অর্থে এত বড় কর্মীবাহিনী রাখার যৌক্তিকতা কোথায়?”

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি নিজের ঐতিহাসিক বক্তৃতা লেখার সময় বের করতে পেরেছিলেন। সেই তুলনায় বর্তমান মন্ত্রীদেরও নিজেদের বক্তব্য প্রস্তুত করার সক্ষমতা থাকা উচিত।

সমালোচকদের দাবি, অর্থ মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক যোগাযোগ কর্মকর্তা, জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ এবং আইনসভার বক্তৃতা লেখক কর্মরত রয়েছেন। এসব পদে কর্মরত অনেকে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ৭০ হাজার ডলার পর্যন্ত বেতন পান। ফলে অতিরিক্তভাবে বাইরের পরামর্শক নিয়োগ করাকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বলেই মনে করছেন অনেকে।

বিতর্কের মূল কারণ কেবল একটি বক্তৃতা নয়; বরং এটি কানাডা সরকারের সামগ্রিক ব্যয় কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। ২০২৫ সালের বাজেট এবং চলতি বছরের স্প্রিং ইকোনমিক আপডেটে সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, বাইরের ঠিকাদার ও পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় কমানো হবে। করদাতাদের অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এ ধরনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু সরকারি তথ্য বলছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ট্রেজারি বোর্ড অব কানাডা সেক্রেটারিয়েটের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাইরের ঠিকাদার ও পরামর্শক বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার। আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ২০০ কোটি ডলার বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আগামী অর্থবছরে পেশাদারি ও বিশেষায়িত সেবা গ্রহণ বাবদ সরকারের ব্যয় ২ হাজার ৬৬০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডা সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরামর্শক নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, জনসংযোগ, নীতি বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বক্তৃতা লেখা অনেক ক্ষেত্রেই এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ফ্রিল্যান্স ঠিকাদারদের ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, বিশেষ দক্ষতা ও দ্রুত কাজ সম্পন্নের জন্য কখনও কখনও বাইরের বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি সরকারি দক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে তোলে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন কানাডার জনগণ উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে রয়েছে। ফলে করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়ে জনসাধারণের সংবেদনশীলতা আগের চেয়ে অনেক বেশি।

এদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টি নিয়ে সরকারকে চাপে ফেলতে শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, সরকার একদিকে সাশ্রয়ের কথা বলছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর বদলে আরও বেশি পরামর্শক নির্ভর হয়ে উঠছে। তারা সরকারি খরচের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

একটি বাজেট বক্তৃতা লেখার জন্য বাইরের ঠিকাদার নিয়োগের ঘটনা এখন কানাডায় সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে। করদাতাদের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles