
কুইবেক প্রদেশে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতা বা ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রস্তাব সামনে এসেছে। এই প্রস্তাবিত আইন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও বিষয়টিকে মানবিক ও জরুরি সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন নিহত এক নারীর বোন রাচেল রেনোড। তিনি প্রাদেশিক আইনসভার সব রাজনৈতিক দলের প্রতি দলীয় বিভাজন ভুলে দ্রুত আইনটি পাস করার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাচেল রেনোড আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে তার বোন গ্যাবি রেনোড নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই তাদের পরিবারের জীবন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। পরিবারের সেই শোক ও অসহায়ত্বই তাকে এখন সামাজিক সচেতনতা ও আইন পরিবর্তনের আন্দোলনে যুক্ত করেছে।
তিনি বলেন, গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার অনেক নারী ভয়, লজ্জা কিংবা সামাজিক চাপের কারণে সময়মতো সাহায্য চাইতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানতেও পারেন না যে তাদের বর্তমান বা সাবেক সঙ্গীর বিরুদ্ধে অতীতে সহিংসতার অভিযোগ ছিল কিনা। নতুন আইনটি সেই অন্ধকার জায়গাতেই আলোর পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। রাচেল রেনোড আশা প্রকাশ করেন, গ্রীষ্মকালীন বিরতিতে যাওয়ার আগেই প্রাদেশিক আইনসভা বিলটি পাস করবে। তার মতে, প্রতিটি বিলম্ব মানে আরও কোনো পরিবারকে একই ধরনের ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া।
কোয়ালিশন অ্যাভেনির কুইবেক সরকারের প্রস্তাবিত এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো যে ব্যক্তি নিজের বা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তিনি যেন তার বর্তমান বা সাবেক সঙ্গীর গার্হস্থ্য সহিংসতার অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন। আইনটি কার্যকর হলে একজন আবেদনকারী অনলাইনে অথবা থানায় গিয়ে একটি নির্ধারিত ফরম পূরণ করে তথ্যের জন্য আবেদন করতে পারবেন। শুধু ভুক্তভোগীই নয়, বরং ঝুঁকিতে থাকা কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী যে কেউ এই তথ্য চেয়ে আবেদন করতে পারবেন। এই ধরনের আইন সম্ভাব্য সহিংস সম্পর্ক সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দিতে পারে এবং বহু নারী ও শিশুর জীবন রক্ষা করতে সহায়ক হতে পারে।
কুইবেকের ডেপুটি প্রিমিয়ার ইয়ান ল্যাফ্রেনিয়ের সংবাদ সম্মেলনে রাচেল রেনোডের উপস্থিতিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রেনোডের প্রচারণা ও সচেতনতা তৈরির উদ্যোগই সরকারকে বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ল্যাফ্রেনিয়ের বলেন, জনগণ এখন বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এই বিল দ্রুত পাস করাই হবে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন। অন্যদিকে, কুইবেকের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেশেটও পূর্বে এই আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে প্রাদেশিক আইনসভার হাতে আর মাত্র চার সপ্তাহ কার্যক্রম চালানোর সময় রয়েছে। ফলে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিলটি পাস হবে কিনা, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়েই ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স একটি গভীর সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক সময় সম্পর্কের শুরুতে সহিংস প্রবণতার তথ্য গোপন থাকে, যা পরে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। কুইবেক সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকেই “প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা আইন” হিসেবে দেখছেন।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই আইন কেবল তথ্য জানার অধিকারই নিশ্চিত করবে না, বরং ভুক্তভোগীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। কেউ যদি আগেভাগে জানতে পারেন যে তার সঙ্গীর বিরুদ্ধে অতীতে সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে, তাহলে তিনি নিজের ও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
রাচেল রেনোডের বক্তব্যে ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি সমাজের এক কঠিন বাস্তবতাও উঠে এসেছে। গার্হস্থ্য সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের সংকট নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তা, নারী অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। এই আইন পাস হলে কুইবেক কানাডার সেইসব অঞ্চলের কাতারে যুক্ত হবে, যারা গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধে আরও স্বচ্ছ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এখন দেখার বিষয়, রাজনৈতিক দলগুলো মানবিক এই ইস্যুতে কত দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে।

