
সাতটা দশ।
নাস্তা সেরে রেডি হয়ে বাইরে আসতেই গিন্নি পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, দখিনা নামতেছে!
আমি আবার বাসায় ঢুকে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বিদায় নিয়ে ছুটতে থাকি বাস স্টপের দিকে। আমার পেছনে আরেক ভদ্রলোক; সেও হয়তো বাস ধরবে।
বাসে মোটামুটি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। যাত্রীদের বাসি নি:শ্বাসের গন্ধ, ইলেক্ট্রিক মোটরের টানা ‘চি চি’ শব্দ। সবাই চুপচাপ। কেউ আরেকদফা ঘুমিয়ে নিচ্ছে। অনেকে সময় কাটাতে স্ক্রীন স্ক্রল করে যাচ্ছে।
ব্লেয়ার স্টেশনে গিয়ে ছুটতে থাকি লাইট ট্রেন ধরতে। লোকজন পিঁপড়ার মতো ছুটছে। ভাগ্যক্রমে সিট পেয়ে ফেইসবুকে অনলি মি প্রাইভেসিতে লিখতে থাকি; এই এক সুযোগ।
অটোয়ার সিটি ট্রান্সপোর্ট ভালোই। গাড়িতে অফিস যেতে লাগে বিশ থেকে পয়তাল্লিশ মিনিট, নির্ভর করে ট্রাফিক জ্যামের ওপর। আর বাসে পয়তাল্লিশ মিনিট।
.
আমাদের গাড়িটা ভেঙে নষ্ট হয়ে গেছে। জীবনের প্রথম একসিডেন্ট। ইন্সুরেন্স কোম্পানি আর ওটাকে রাস্তায় নামাতে দেয়নি, বাতিলের খাতায় তুলে ফেলেছে।
সেদিন ঘটনা ঘটেছিল রাস্তা থেকে অফিসের গ্যারেজে ঢুকবার সময়। তীরে এসে তরী ডোবার মতো। খুব তুষার পড়ছিল, আবহাওয়া সতর্কতা জারি ছিল। রাস্তা পিছলা, অনেক রাস্তা পাশের শক্ত বরফে সরু হয়ে গিয়েছিল। তারপর.. সামনে থেকে দ্রুতগামী আরেকটা গাড়ি এসে দিলো ধাক্কা। ব্রেক কাজ করেনি পিচ্ছিল রাস্তায়। সজোরে ধাক্কা খেলো মুখোমুখি। মিলিসেকেন্ডে সব ভেঙে চুরমার।
কলিগ, ম্যানেজার চলে এসে পরামর্শ দিতে লাগলো করনীয় সম্পর্কে। পাশেই ছিল টো কম্পানির গাড়ি। তাদের লেগে গেল ঈদ, পেয়ে গেল দুই কাস্টমার! গাড়ি দুটোকে তারা চ্যাং-দোলা করে তুলে নিয়ে গেল। পুলিশ আসলো না, আহত না হলে আসে না। কলিশন সেন্টারে রিপোর্ট করে বাসায় ফিরে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
.
বিকালে স্কুল থেকে প্রথমে বাসায় ঢুকলো দখিনা। শুনে থ। জোক করছি কিনা বুঝবার চেষ্টা করলো। তারপর ফিরলো বিত্ত; সে শুনে মাথা নিচু করে খুব আপ্সেট হয়ে কয়েকমিনিট দাঁড়িয়ে থাকলো নিঃশব্দে। গিন্নি কাজ থেকে ফিরে বাচ্চাদের কাছে শুনে কিছু না বলে টেনশনে হাঁটাহাঁটি করে কাছে এসে ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলো, “কী হইছে!?”
ভাবছিলাম আম্মাকে জানাবো না। কয়েকদিন পর বোনের মুখে শুনে আম্মা কী বলল, কেমন করলো;… সেটা আর না বলি।
আম্মা সবসময় বলে, যেন সাবধানে গাড়ি চালাই। স্নো পড়লে অফিসে যাবারই বা কি দরকার?
এক মাস হয়ে গেল। ইন্সুরেন্স কোম্পানি এক মাসের জন্য ভাড়া করা গাড়ি দিয়েছিল। পরশু থেকে নিয়ে নিয়েছে।
আমি এখন আর তেমন চিন্তা করি না। আমাদের জড়বস্তুর ওপর খুব মায়া, মানুষের ওপর কম। এতকিছুর পরও যে আমরা ভালো আছি, সেটা ভুলে যাই। সুস্থতা আল্লাহ তায়ালার সবচাইতে বড় নিয়ামত।
হঠাৎ সেদিন বোধোদয় হলো; তিড়িং করে লাফিয়ে লেপ ফেলে, হেসে ফেললাম। আরে, কয়েক সপ্তাহ জুড়ে যে এতো আজাইরা দু:শ্চিন্তা করলাম, শুয়ে শুয়ে সময় নষ্ট করলাম; এসবের ফলাফল কী?
শুন্য!
শুধু গাড়ির স্পিকারে ভেসে আসে না সুচিত্রা মিত্রের নেশা ধরানো, মধু মিশ্রিত, বকুল ফুলের গন্ধে ভরা ভয়ানক নিখুঁত কন্ঠ। গেয়ে ওঠে না-
“কৃষ্ণ কলি আমি তারেই বলি,
কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে।
কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।
ঘোমটা মাথায় ছিল না তার মোটে,
মুক্তবেণী পিঠের ‘পরে লোটে..”
কন্ঠের কি অবিশ্বাস্য কারুকার্য!
খুব মিস করি।
খুব..
.
এখন অবশ্য আমি আরও বহুগুণ দামি আর বড় গাড়িতে চড়ি। সম্পুর্ন ইলেক্ট্রিক। দাম প্রায় পনেরো কোটি টাকা। ড্রাইভার ড্রাইভ করে নিয়ে যায়। খরচও কমে হয়েছে চারভাগের মাত্র এক ভাগ।
রাজার হালে অফিস যাই।
অটোয়া, কানাডা

