খোলা কবর

খোলা কবর - the Bengali Times
কেরানীগঞ্জ থেকে শাকিলের বাবা এসেছিল কাজের সন্ধানে

কেরানীগঞ্জ থেকে শাকিলের বাবা এসেছিল কাজের সন্ধানে। ঢাকায় আসার দুদিনের মাথায় তাকে একটি লাশ টানতে হয়। সে অনেক দিন আগের কথা। তখন গুটিবসন্ত এক মহাবিপদের নাম। সেই গুটিবসন্তে মারা গেল বস্তির এক লোক। ভয়ে সবাই পালিয়ে গেলেও শাকিলের বাবা কোনরকম দুজন লোক যোগাড় করে কবরস্থানে লাশ নিয়ে গেল। লাশ টেনেই শেষরক্ষা হয়নি। শাকিলের বাবাকে কবরও খুদতে হয়েছিল সেদিন।

যে লোক কবরের দায়িত্বে ছিল সে বলল, ওই মিয়া খাড়ায় আছ ক্যালা। হাত লাগাও না ক্যান, নয়া নাকি?

- Advertisement -

হ, দুইদিন আগে ঢাকায় আইছি

ক্যালা, ঢাকায় আইচ ক্যালা?

কামের খোঁজে

নাম কি তোমার?

নাম দিয়া কি করবেন, পারলে একটা কাম দেন।

আরে জ্বালা! কামের লিগাই তো কইতাছি হাত লাগাও। এইটাই তোমার কাম। আমার নাম শুক্কুর আলী। আমার একজন সারগিত আছি্লো। তোমার মতই গেরাইম্যা। দুইদিনের কথা কইয়া বাড়িত গেছে মাগার আজ জুম্মায় জুম্মায় আটদিন আয়নের নাম নাই। বুঝলা না মিয়া, ভাইগ্যা গেছে গা। হালায় কাম চোর। গোর খুদাইয়ের কাম করতে বুকের পাটা লাগে। অর উপড়ে মহামারী লাগছে দেশে। করবা কাম?

শাকিলের বাবার নীরবতার মাঝে শুক্কুর মিয়া বলল, নাইমা পড় মিয়া। ধইরা লও এইড্যাই তোমার নসিবে লিখা আছিলো।

সেই থেকে কবর খোদাইয়ের কাজে লেগে গেল শাকিলের বাবা। কিছুদিন পর গ্রামে গিয়ে ছোট্ট শাকিল ও তার মাকে নিয়ে এল ঢাকা শহরে। এই ধারাবাহিকতায় শাকিলও সারাজীবন একই কাজ করে যাচ্ছে। কবর খোদাই করা এখন তাদের খানদানি কাজ। আর দশটা পেশার মত কোনরকম পেটে ভাতে চলছিল শাকিলের সংসার কিন্তু করোনার কারণে এখন বাপ-বেটার রোজগার ভালই হচ্ছে। মাঝে মাঝে দুজনে পেরে ওঠে না। সকাল হতে না হতেই লাশ আসতে থাকে। শাকিলের বাবা তো মহা খুশি।

আজও বেশ ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরেছে তারা। সন্ধ্যার পর শাকিলের বাবা বলল, দেখছস শাকিল্লা! লাশ তো বানের লাহান ভাইসা আইতাছে। আল্লাহ রহমতে লাশের কমতি নাই। কিছুদিন আগেও বেবাক মানুষ খিচ্চা ছিল, মরণের নাম নিশানা আছিল না। এখন আমির গরিবের মধ্যে কোন ফারাক নাই। ডেইলি মানুষ মরতাছে। বহুতদিন পর আল্লাহ মুখ তুইলা তাকাইছে। এখন আমাগো ফয়দা লইতে হইব। ওষুধপাতি বাইর হইয়া গেলে সব কিন্তু খালাস। যা পারছ কামাইয়া কিছু ব্যাঙ্কে রাখনের চিন্তা কর। তোর পোলারেও কামে লাগায়া দে।

পিতার কথা শুনে ক্ষেপে যায় শাকিল। কও কি বাজান। তোমার কি মাথা খারাপ হইলো নি। চারটা মাইয়ার পর আল্লাহ আমারে একটা পুলা দিছে। হেই পোলারে দিয়া গোর খোদামু? তোমার স্ক্রু ঠিক আছে নি?

আরে, আমি কি কইছি ওরে দিয়ে মাটি কুপাইবি? হাল্কা পাতলা কাম করাইতে অসুবিধা কী? দুই’চাকা মাটি এদিক ওদিক সরাইলেও লাভ। আস্তে আস্তে সব শিক্কা যাইব।

দ্যাহো বাবা তোমারে কইছি না, রাশা’রে আমি ডাক্তার বানামু। আর তুমি কইতাছ ওরে গোর খোদনের কামে লাগাইতে। আর একবারও এই কথা জবানে আনবা না।

শাকিলের বাবা খ্যাঁক করে উঠল, আর কাম পাইলো না। পোলারে হে ডাক্তার বানাইবো। আরে হারামখোর, এই ডাক্তারের জাত হইলো গিয়া আমাগো শত্রু। এগো লাইগ্যা আমাগো কারবার খারাপ হইয়া গেছে। হালায় রুগী মরবো কইতত্থন? ডাক্তার আর হাসপাতালে গিজগিজ করতাছে ঢাকা শহর। আর, হে কিনা কয় পোলারে ডাক্তার বানাইবো। আরে হালারপুত, আল্লাহ করোনা দিছে হের লিগা কিছু খাইতে পারতাছ। শুকুর কর। শুকুর কর। পোলারে ডাক্তার বানাইলে দেখবি তোর কপাল পুড়তে বেশিদিন লাগবো না।

রাহেলা ভেতর থেকে স্বামী আর শ্বশুরের কথা শুনছিল। প্রতিদিন সকাল হতেই বাপ ছেলের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। পারলে রাতের অন্ধকারেও ওরা ঝগড়া করে। এক উঠানে পাশাপাশি দুটি ঘর। মিল মহব্বত করে থাকলে কত ভালো লাগে কিন্তু তা না, কথায় কথায় চেঁচামেচি। তবে এসব নিয়ে রাহেলা মাথা ঘামায় না। ঝগড়া করার সময় হলে নিজ পর্ব সে শক্তভাবেই সম্পূর্ণ করতে পারে। কারোর সাহায্য লাগে না। বেশিরভাগ সময় রাহেলাই জিতে যায়। না তার শ্বশুর, না শাশুড়ি। এমন কি শাকিলও পেরে ওঠে না রাহেলার সাথে।

রাহেলার হঠাৎ খেয়াল হলো তার নয় বছরের ছেলে রাশা এখনো ফেরেনি। কখনো এত দেরি করে না সে। আজ শনিবার। প্রাইভেট মাষ্টার না আসার কারণে রাহেলা বুঝতে পারেনি ছেলের ঘরে ফেরার সময় পার হয়ে গেছে। মাষ্টার না এলে কী হবে! সন্ধ্যার পর রাশাকে একা একাই পড়তে হবে। বোনেরা তাকে সাহায্য করবে।

রাহেলা ষাঁড়ের মত চেঁচিয়ে উঠল। তোমরা বাপে পুঁতে ঝগড়া থামাইবা না আমার রাশা কই গেল খুইজা দেখবা। এ কথা বলেই সে রাশার নাম উচ্চারণ করতে করেতে গলির মাথায় চলে এল। প্রথমে ডাইলপুড়ির দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল। তারপর মুদি দোকানদার। কেউ রাশার কথা কিছু বলতে পারল না।

কবরস্থান থেকে খানিকটা দূরে শাকিলদের বাসা। অনেক রাত হয়ে গেছে। আজকের মত খোঁজাখুঁজি শেষ। এমনিতেই এই এলাকাটা বেশ নিরিবিলি। তার ওপর রাস্তার দুটো লাইট ভাঙ্গা। শাকিলদের বাসার অর্ধেক আলো আসে সিটি কর্পোরেশনের লাইট পোস্ট থেকে। লোকজনের কমতি নেই কিন্তু সবাই মুখ গম্ভীর করে আছে। নিঝুম পরিবেশে একমাত্র রাহেলার কণ্ঠই শুনছে সকলে।

রাহেলা নিজের নাম এবং স্বামীর নামের সাথে মিল করে ছেলের নাম রেখেছিল রাশা। সেই ছেলের জন্ম বৃত্তান্ত সুর করে গাইতে লাগল। রাশার বোনগুলো কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। হাসপাতাল, থানা, বড় রাস্তা, ছোট রাস্তা সবখানে খুঁজে খুঁজে মধ্যরাতে হতাশ হয়ে ফিরে এসেছে শাকিল। মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে নাতিকে খুঁজেছে শাকিলের বাবা। আশপাশের লোকজন যারা সান্ত্বনা দিতে এসেছিল তারা বলেছে, আল্লাহ আল্লাহ করো। সকাল হলে সবাই মিলে খুঁজতে যাব। কোথায় আর যাবে। আছে হয়তো কোন বন্ধুর বাসায়।

রাহেলা কান্নার সুর পরিবর্তন করে বলতে লাগল, এইটুক্কু পোলার আবার বন্ধু কী? আমার রাশা মিয়ার কোন দোস্ত-বন্ধু নাই। ও না কারোর বাইত্তে যায়, না কেউ ওর লাইগ্যা আমাগো বাইত্তে আহে। আমি ওরে কাওর লগে মিশতে দেই না। দোস্তোগো লগে ঘুরলে ওরে ডাক্তার বানাইবার পারুম না। তোমারা হুধা পেঁচাল পারতাছ। আমার পোলারে খুইজা দাও। ভাই গো… আমি তোমগো পায়ে পড়ি।

মহল্লার লোকজন পরের দিন সকালে আবার আসতে শুরু করেছে। ছেলের শোকে শাকিল সারারাত ঘুমায় নি। মাজারে যাবে বলে মানত করেছিল কিন্তু রাহেলা ঘন ঘন জ্ঞান হারাচ্ছে তাই যেতে পারছে না। এদিকে নতুন করোনা লাশ নিয়ে এসেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। কিছুক্ষণ পরপর শাকিলের মোবাইল ফোন বেজে উঠছে। শাকিলের বাবা বলল, শাক্কিলা তুই কি একা একা মাজারে যাইতে পারবি, না আমিও যামু তোর লগে?

শাকিল বলল, না বাবা, তুমি কবরস্থানে যাও। সাথে সেলিমরে লইয়া যাও। একা দুইটা কবর খুদতে পারবা না।

শাকিলের বাবা ছেলের কথার জবাব দিলো, কোন অসুবিধা হইব না বাপ। গতকাইল একটা কব্বর খুইদা আইছিলাম। মনে করছিলাম মাঝ রাইতে যদি কোন লাশ আহে তাইলে ওইডারে কামে লাগামু। একটা খুদা আছে এখন আর একটা খুদলেই হইব। এই বলে শাকিলের বাবা সেলিম নামের ছেলেটিকে বলল, যা তো সেলিম তোর চাচীর কাছ থাইকা আমার নাকমাটা লইয়া আয়। সেলিম ভেতর থেকে ঘরে বানানো একটা মাস্ক এনে শাকিলের বাবার হাতে তুলে দিল। সেটা নাকে উপর বসিয়ে শাকিলের বাবা কোদাল হাতে রওনা দিল। শাকিল সেলিমকে উদ্দেশ্য করে বলল, সেলিম তুই একটু বাপের লগে যা।

রাহেলা এখন মোটামুটি সুস্থ আছে। ওর মাথায় পানি দিয়ে শাকিল ঘরের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক তখনই সেলিম দৌড়ে এসে বলে, শাকিল ভাই জলদি আহেন রাশারে পাওয়া গেছে।

কী কইলি? কই পাইলি?

সেলিম বলল, আহেন আমার লগে।

সেলিম ছুটছে, সেলিমের পেছন পেছন শাকিল মিয়া। তার পেছনে রাহেলা, আমিনা, কাজল, শাবনূর। বাড়িতে একা রয়ে গেল শাকিলের অন্ধ মা আর ছোট মেয়ে মিমি। গলি থেকে বের হয়ে কবরস্থানের দিকে যেতে যেতে শাকিলের পেছনে লাইনটা বড় হতে থাকে। মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিরাট কবরস্থানের শেষ মাথায় চলে যায় সেই মিছিল।

রাশাকে পাওয়া গেছে কিন্তু কেউ জানে না কী করে সে দাদার খোদাই করা খোলা কবরের নিচে পড়ে আছে। ইতিমধ্যে পুলিশ এসে গেছে। তারা কাউকে লাশ ছুঁতে দিচ্ছে না। প্রথমে করোনার স্যাম্পল নেওয়া হবে তারপর পুলিশ যখন অনুমতি দিবে তখন হবে দাফন কাফন।

বন্ধ হচ্ছে না রাশাকে দেখতে আসা উৎসুক মানুষের ঢল। কাফনে মোড়ানো নয় অথচ কবরের ভেতর লাশ, তাই হয়তো সকলের মধ্যে এত আগ্রহ। যে গেট দিয়ে সবাই ঢুকছে সেই গেটের পাশে বসে আছে রাশার সমবয়সী একটি ছেলে। ওর নাম, ঝুড়ি। বাচ্চা ছেলে বলেই ঝুড়িকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত রাশা জীবিত ছিল। রাশা আর ঝুড়ি কবরস্থানের মধ্যে হেঁটে বেরিয়েছে। দুজন হাঁটতে হাঁটতে একসময় চলে এসেছিল খোলা কবরটির কাছে। কবরের আলগা মাটির ওপর বসেই একসময় চলছিল ওদের গল্প। এক পর্বে একজন অন্যজনের গায়ে হাত দিয়ে দেখে দুজনেরই শরীর বেশ গরম। রাশা বলেছিল, মনে হয় আমারে ধরছে, ভয়ে তিনদিন মায়েরে কিছু কই নাই। রাশার কথা শুনে ঝুড়ি বলে, তোরে ধরলে আমারেও ধরছে।

ভাঙ্গা একটা ইটের ওপর মাথা নিচু করে ঝিমাচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে গায়ের উত্তাপ মাপছে ঝুড়ি। তার সমস্ত শরীর নীল হয়ে আছে কিন্তু কেউ ওর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ছোট বেলায় আমের একটি ঝুড়ির মধ্যে এনে কেউ ওকে রেখে যায় কবরস্থানের গেটে। তারপর দশজনের হাতে সে মানুষ হয়েছে। মানুষের মুখে মুখে নাম হয়ে গেছে ঝুড়ি। কজন চেনে তাকে? চিনলেই বা কী? অথচ আর সবার মত ঝুড়ির মধ্যেও করোনা আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। কী করবে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। জ্বর কমার কোন লক্ষণ নেই। ভয়ে কুঁকড়ে আসছে ওর মুখ। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তবুও পানি চাইবার শক্তি নেই। গায়ে যদি একটা জামা থাকতো তাহলে হয়তো এভাবে কাটা দিতো না শরীর। কিছুতেই ভুলতে পারছেনা খোলা কবরের পাশে বসে কথা বলতে বলতে ধপ করে রাশার নিচে পড়ে যাওয়ার শব্দ।

গতকাল রাতেও সে আযান শুনেছে। কিন্তু তখন সে দৌড়ুচ্ছিল। যার ঘর নেই বাড়ি নেই সে দৌড়ে কোথায় যেতে চায় কে জানে। তবুও সে দৌড়েছিল যতক্ষণ সে দৌড়াতে পারে। তারপর নিজেকে লুকিয়ে রাখে লোকচক্ষুর আড়ালে। আজও ঝুড়ি একই আযান শুনছে অথচ দৌড়ানো তো দূরের কথা কিছুক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকতে পারলো না। কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে গেল ফুটপাথের ওপর। অনেক কষ্ট করে কবরস্থান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে এনেছিল। এখনে লোকজনের ভিড় নেই তবুও এটা ফুটপাথ। কিছুদূর গিয়ে কবরস্থানের গেটের সাথে যা মিশে গেছে। এখানেও ড্রেন আছে। আছে আবর্জনা। কে বলেছে করোনা হলে ঘ্রাণ স্বাদ কিছু থাকে না। ঝুড়ি এখন আমের গন্ধ পাচ্ছে। ফজলি আম না সিন্দুরা বলতে পারবে না। কিন্তু চোখ বুজে পাকা মিষ্টি আমের গন্ধ পাচ্ছে সে। মৃদু কাঁপছে তার শরীর। যেমন করে জন্ম হবার দু ঘণ্টা পর ঝুড়ির ভেতর কাপড় প্যাঁচানো কচি শরীরটা কেঁপেছিল একদিন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বটে তবুও নোংরা কাপড়ের নাকমা বেঁধে রেখেছে নাকে।

আর একটি ভোরের আলো এসে পড়েছে ফুটপাথের ওপর। বেড়েছে লোক চলাচল। ঝুড়িকে দেখে কে কী ভাবছে জানি না। কিন্তু আমি বুঝলাম না ঐ নাকমা কি নিজের জন্য না অন্যরা যাতে বাঁচতে পারে সেজন্য পরে ছিল ছেলেটি।

 

স্কারবোরো, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles