ওহ কানাডা হায় কানাডা

ওহ কানাডা হায় কানাডা - the Bengali Times
শুধু যে বাংলাদেশ থেকে আশা কিছু লোক কানাডাকে বদলে দিচ্ছে তা নয় পৃথিবীর অনেক দেশের অগুনিত মানুষ কানাডা এসে তাদের এখতিয়ার ভুক্ত অতীতের মন্দ কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে

অনেক আশা নিয়ে এদেশে এসেছিলাম। আজ যখন দেখি নিজস্ব প্রথা ও ঐতিহ্যের সাথে আপস করে এবং রীতিনীতিতে ছাড় দিয়ে কানাডা অন্যদেশগুলোর মত হয়ে যাচ্ছে তখন ‘কানাডিয়ান’ বলে অনেকের খোটা খেতে শুরু করেছি। বাংলাদেশর আত্মীয়স্বজন বলা শুরু করেছে কী বলছেন এসব, এমন কাণ্ড কানাডাতে হচ্ছে?

শুধু যে বাংলাদেশ থেকে আশা কিছু লোক কানাডাকে বদলে দিচ্ছে তা নয়, পৃথিবীর অনেক দেশের অগুনিত মানুষ কানাডা এসে তাদের এখতিয়ার ভুক্ত অতীতের মন্দ কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। অথবা নিজ নিজ দেশের মন্দ কাজের ফসল থেকে উৎপাদিত বীজ কানাডার মাটিতে চাষ করতে শুরু করেছে ওরা। গত বত্রিশ তেত্রিশ বছরে অনেক পরিবর্তন দেখলাম। একসময় ঠাট্টা করে বলতাম এদেশে মারা গেলে সরাসরি বেহেশত। কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতাম, এখানে অন্যায় করার সুযোগ নেই, মিথ্যা বলতে হয় না। কাউকে ঘুষ দিতে হয় না। ঘুষ খেতে হয় না। এক পয়সা মেরে দেবার সুযোগ নেই, নিয়মনীতির মধ্যে চলতে হয় সারাক্ষণ। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ তার উদাহরণ সবখানে। কিন্তু সেই কানাডা এখন আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে।

- Advertisement -

প্রথম দেখলাম আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি শুরু করে দিল। কেউ আবার ব্যাঙ্ক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নেবার পর পাঁচ ছয় বছরের জন্য দেশে চলে যেত। এক নাগারে ১৫-২০ বছর ওয়েলফেয়ারে আছে এমন লোকজনের দেখা পেতে লাগলাম। গাড়ীর হর্ন কানে আসতে লাগলো। ‘যত পারেন সরকারের দান ও অনুদানের হাতিয়ে নেবেন এমন পরামর্শ দিতে শুরু করলো কেউ কেউ। কাজ করে কী করবেন, তিন মাস কাজ করবেন নয় মাস Disability ও Works compensation নিবেন ইত্যাদি। এই তালিকা লম্বা হতেই থাকবে।

এই যদি হয় একটি দেশ থেকে আশা লোকদের চিন্তাভাবনা তবে ভেবে দেখুন পৃথিবীর নানা দেশের মন্দ লোকেরা মিলে কানাডাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আশার কথা হলো, কানাডার দু’একটি বড় শহর যেমন টরেন্টো মন্ট্রিয়াল কেলগ্যারি ইত্যাদি বাদ দিলে বাকী ৯০-৯৫ ভাগ কানাডা এখনো আগের মতই আছে। আর, নিরাশার কথা হলো আমার মত অদক্ষ লোকের এই সমস্ত বড় বড় শহরে থাকা ছাড়া উপায় নাই। অনেক দক্ষ লোকের দক্ষতার মাঝ দিয়ে কোন ভাবে স্যান্ডুইচ হয়ে বেঁচে আছি এই যা।

আমার এক কলিগ এর একটা মন্তব্য দিয়ে শেষ করছি। মাইকেল নামের এই সহকর্মীকে প্রায়ই মুখ ভার করে বসে থাকতে দেখি। মাইকেল খুবই সহজ সরল প্রকৃতির লোক। যাকে বলা যায় harmless personality, ইদানীং তার মন খারাপ হবার কারণ হলো গাড়ি চাপা দিয়ে বা এক্সিডেন্ট করে কী করে একটা মানুষ পালিয়ে যেতে পারে? মাইকেল বলে, যে লোকটা আঘাত পেল তাকে তো সাহায্য করার জন্য কাউকে না কাউকে এগিয়ে আসতে হবে। যে লোক (গাড়ীর ড্রাইভার) দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে সেইতো সবার আগে সেখানে উপস্থিত ছিল। তার-ই দাঁড়িয়ে থাকার কথা, পুলিশ এম্বুলেন্স তাকেই ডাকতে হবে। যে আঘাত পেয়ে রাস্তার ওপর পড়ে আছে সে কীভাবে ওসব করবে। এই ভেবে ভেবে আমার বন্ধু দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। ও সারাক্ষণ বলে what is wrong Akhtar? আমি শুধু হু! করি আর ওর মনের দুঃখ অনুভব করতে চেষ্টা করি।

এই ভাবনা আসলে একজন ব্যক্তি মাইকেলের মনের কথা না। এটা একজন প্রকৃত কানাডিয়ান এর দুঃখ। মাইকেলের অনুযোগ কতটা গভীর সেটা বোঝার জন্য ওর আর একটি কথা বলছি। ‘জানো আকতার, আমি যখন প্রথম গাড়ি চালাতে শিখলাম তার বছর দুয়েক পর পার্কিং করতে গিয়ে একদিন একটা গাড়িকে পেছনের দিক থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিলাম। খুব সামান্য ক্ষতি হয়েছিল অন্য গাড়িটির। আমি প্রায় আধাঘণ্টা বসে ছিলাম কিন্তু গাড়িটির চালক ফিরে এলো না। এরপর একটা কাগজে সরি লিখে আমার ফোন নম্বর সহ জানালায় গুঁজে চলে এলাম। সেদিন রাতেই কাঙ্ক্ষিত কলটি এলো। অবাক কাণ্ড কি জানো? এক ভদ্রমহিলা ফোন করে বারবার সরি বলতে লাগলো। সে বলল আমি বোধ হয় ঠিক মত পার্ক করতে পারি নাই। তোমার গাড়ীর জন্য আমি ক্ষতিপূরণ দিতে রাজি আছি’।

মাইকেলের ভাবনাকে সম্মান জানিয়ে মনে মনে বললাম বন্ধু, এই কানাডাতেই আমি এসেছিলাম।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles