
মেক্সিকোর একাধিক অঞ্চলে দ্রুত অবনতি হওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেখানে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য উচ্চমাত্রার সতর্কতা জারি করেছে কানাডা সরকার। পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ জানিয়েছেন, সোমবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ২৬,৩০৫ জন কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা-এর কাছে নিজেদের নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায়ই প্রায় ৮,০০০ জন নতুন করে যোগাযোগ করেছেন যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা স্পষ্ট করে।
হাউস অব কমন্সের ফোয়ারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী বলেন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বেচ্ছামূলক হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তিনি জানান, কানাডার ইমার্জেন্সি ওয়াচ অ্যান্ড রেসপন্স সেন্টার গত একদিনে ৪৪০টি কল পেয়েছে, যেখানে নাগরিকরা মূলত ফ্লাইট পরিস্থিতি, ভ্রমণ পরামর্শ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য জানতে চেয়েছেন।
সরকারি পর্যবেক্ষণে যে অঞ্চলগুলোকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে – জালিস্কো (গুয়াদালাহারা, পুয়ের্তো ভাল্লার্তা), গুয়েরেরো (আকাপুলকো), মিচোয়াকান, সিনালোয়া (মাজাতলান), কুইন্টানা রু (ক্যানকুন) এবং বাজা ক্যালিফোর্নিয়া (তিহুয়ানা, তেকাতে)।
মন্ত্রী জানান, এসব অঞ্চলে পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং মেক্সিকোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
রবিবার সন্ধ্যায় কানাডা সরকার মেক্সিকোর জন্য ভ্রমণ পরামর্শ হালনাগাদ করে নাগরিকদের “উচ্চ মাত্রার সতর্কতা” অবলম্বনের নির্দেশ দেয়। কয়েকটি অঞ্চলে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। জালিস্কো ও নায়ারিত রাজ্যে ‘শেল্টার-ইন-প্লেস’ নির্দেশ কার্যকর রয়েছে অর্থাৎ বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে অবস্থান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্য এলাকাগুলোতেও স্বল্প নোটিশে কারফিউ জারি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রভাবিত অঞ্চলে থাকা কানাডিয়ানদের স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলতে, বড় জনসমাগম এড়িয়ে চলতে এবং নিরাপদ না হলে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটননির্ভর শহরগুলোতে সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি ঘটতে পারে এমন আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
আটকে পড়া নাগরিকদের দেশে ফেরানোর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী পরিষ্কারভাবে জানান, এ মুহূর্তে কানাডা সরকার নিজস্ব বিমান পাঠানোর পরিকল্পনা করছে না। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক ফ্লাইটে যাত্রীদের ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর। সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে বাতিল হওয়া কিছু ফ্লাইটের পর ওয়েস্টজেট ও এয়ার ট্রানস্যাট মঙ্গলবার থেকে মেক্সিকোর কয়েকটি গন্তব্যে পুনরায় নির্ধারিত ফ্লাইট চালুর ঘোষণা দিয়েছে।
মেক্সিকো দীর্ঘদিন ধরেই সংগঠিত অপরাধ ও মাদকচক্রজনিত সহিংসতার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। তবে পর্যটনকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোতেও যদি অস্থিরতা বাড়তে থাকে, তা কেবল স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নয়, বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কানাডা সরকারের এই উচ্চ সতর্কতা ইঙ্গিত দেয় যে পরিস্থিতি সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিস্তৃত ও অনিশ্চিত।
একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৮,০০০ নাগরিকের নতুন নিবন্ধন দেখায় যে কানাডিয়ানরা পরিস্থিতিকে গুরুত্বসহকারে দেখছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেওয়ার আশ্বাস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক তৎপরতারই প্রতিফলন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা পুনরুদ্ধার। কানাডা ও মেক্সিকোর কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতির উন্নতিই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।

