যে হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়

যে হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় - the Bengali Times
ছবি সংগৃহীত

মৃত্যুর আগের সকালে দীপু চন্দ্র দাস ভোর হতেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ময়মনসিংহ শহরের টিনের ছাউনি দেয়া ছোট্ট ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথমে তার পিতাকে ঘুম থেকে ডাকেন। স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নেন। ১৮ মাসের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তারপর তিনি ৬০ কিলোমিটার দূরের গার্মেন্টস কারখানায় যাওয়ার জন্য বাসে ওঠেন। গার্মেন্টসে তিনি জুনিয়র কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। তার কাজ ছিল এইচঅ্যান্ডএম ও নেক্সটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে রপ্তানির জন্য তৈরি সোয়েটার পরীক্ষা করা।
তার পরিবার আর কখনও তাকে দেখতে পায়নি।

২৪ ঘণ্টা পর ১৮ই ডিসেম্বর ২৮ বছর বয়সী এই যুবককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে জনতা গণধোলাই দেয়। পরে আগুনে পুড়িয়ে দেয় তার মৃতদেহ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাকে কর্মস্থল থেকে টেনে বের করা হয়। মারধর করা হয়। এক কিলোমিটারেরও বেশি দূরে জনাকীর্ণ রাস্তায় টেনে নেয়া হয়। ব্যস্ত মহাসড়কের পাশে একটি গাছে বেঁধে শত শত মানুষের সামনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এই হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে ভারতের জনমনে। গত বছর ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তাদের বেশিরভাগই হিন্দু।

- Advertisement -

পঞ্চাশ দিন পেরিয়ে গেলেও দীপুর বাড়িতে শোক এখনো ভারী হয়ে আছে। একটি অন্ধকার কক্ষ, মাটির মেঝে ও টিনের ছাউনিতে পরিবারটি প্রায় ১৫ বছর ধরে বসবাস করছে। ঘরে আসবাবপত্র বলতে খুবই সামান্য। আছে একটি প্লাস্টিকের টেবিল ও চেয়ার, কয়েকটি খাট, চালের বস্তা, একটি টেডি বিয়ার, এক রেলিংয়ে ঝোলানো কিছু কাপড়। কিস্তিতে কেনা একটি ফ্রিজ ও ছোট টেলিভিশন। এসব এখন দীপুর স্বপ্নের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তার মা শেফালি রানী দাস দর্শনার্থী ঢুকতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকেন- ‘ও দীপু, আমার দীপু কোথায়?’

দীপু ছিলেন রবি দাসের বড় ছেলে। ৫৪ বছর বয়সী রবি দাস পাশের বাজারে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা মজুরিতে চাল, গম ও সবজির বস্তা টানার কাজ করেন। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম তাকে ক্লান্ত করে তুলেছে ও শরীর ভেঙে দিয়েছে। দীপু চাইতেন তার পিতা যেন এখন বিশ্রামে যান। দীপু নিজের বেতন পরিবারের হাতে তুলে দিতেন। কাদা ও টিনের ঘর ছেড়ে একটি পাকা বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখতেন।

হিন্দু-মুসলিমের মিশ্রণে ওই পাড়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা দীপু ছিলেন স্বল্পভাষী মানুষ। মহামারির সময় পরিবারের আর্থিক সংকটে কলেজ ছাড়তে বাধ্য হন। ২০২৪ সালে তিনি সোয়েটার কারখানায় কাজ শুরু করেন। টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। ছুটিতে এলে মেয়ের জন্য চকলেট আনতেন। সন্ধ্যায় টিভিতে কার্টুন দেখতেন।

পাইওনিয়ার নিটওয়্যার কারখানায় ১৪ মাস কাজ করছিলেন তিনি। ৮৫০০ শ্রমিকের এই কারখানা ৪৭০০০ শ্রমিকের একটি গ্রুপের অংশ। মাসে ১৩,৫০০ টাকা বেতনে তিনি প্রোডাকশন লাইনে সোয়েটারের সেলাই পরীক্ষা করতেন। সেখানে ৮৬৮ জন হিন্দু শ্রমিকও কাজ করতেন।

তারপর এলো সেই ডিসেম্বরের সন্ধ্যা। গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি ইসলাম নিয়ে ‘কটুক্তি’ করেছেন।

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ছুটির আগে তিন নারী সহকর্মীর সঙ্গে আলাপে যোগ দিয়ে তিনি নাকি একটি মন্তব্য করেন। যা পরে অবমাননাকর বলে বিবেচিত হয়। সিসিটিভিতে দেখা যায়, কথোপকথনের ৩০ মিনিট পর তিনি বেরিয়ে যান। পরে আবার ফিরে আসেন। কেন ফিরেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে বাইরে গুজব ছড়িয়ে জনতা জড়ো হতে শুরু করে। বাংলাদেশে আলাদা ধর্ম অবমাননা আইন নেই। তবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে কাজকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। কয়েকশ মানুষ কারখানার গেটে জড়ো হয়ে তাকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। পরে তা হাজার ছাড়ায়। সিসিটিভিতে দেখা যায়, গেট ভাঙার চেষ্টা চলছে।

রাত ৮টা ৪২ মিনিটে জনতা পাশের একটি গেট ভেঙে কারখানায় ঢুকে পড়ে এবং দীপুকে টেনে নিয়ে যায়। পুলিশ বলছে, গেট ভেঙে ফেলার হুমকির মুখে কারখানা কর্তৃপক্ষ তাকে হস্তান্তর করে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, কারখানার বাইরে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে লাশ মহাসড়কে এনে গাছে বেঁধে আগুন দেয়া হয়। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগের বয়স ২২ থেকে ৩০। প্রায় ১৫০ জন সরাসরি হামলায় জড়িত ছিল বলে ধারণা। পুলিশ বলছে, এটি একটি ঘৃণাজনিত অপরাধ।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মাত্রা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সরকারি হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে ৬৪৫টি ঘটনা ঘটেছে, যার বেশিরভাগই সাম্প্রদায়িক নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি, হামলার সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ছিল। ঢাকায় প্রতিবাদ হয়েছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ বকেয়া পরিশোধ করেছে ও দীপুর স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকার ৩৫,০০০ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। দীপুর বাড়িতে এখনো সেই রাতের স্মৃতি টুকরো টুকরো হয়ে আছে। তার বাবা-মা অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। এখনো মা প্রতিদিন কাঁদেন। বাবা কাজে ফেরেননি। ঘুম নেই, ক্ষুধা নেই, শান্তি নেই তাদের। রবি দাস বলেন, আমাদের জীবন থেমে গেছে। আর কিছুই চলছে না।

 

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles