
কানাডাতে ‘কুমন’ একটা প্রতিষ্ঠিত টিউটোরিয়াল সেন্টার। ওদের ওয়েব সাইটে দাবী করা হয়েছে যে ওরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোচিং সেন্টার যেখানে প্রি স্কুল থেকে গ্রেড ১২ এর ছাত্রদের স্কুল সময়ের বাইরে ম্যাথ ও রিডিং করানো হয়। ‘টরু কুমন’ নামে এক জন অংকের শিক্ষক এই কুমন পদ্ধতির বিষয় বস্তু ও পরিচালনা নীতির উদ্ভাবন করেন। পথিবীর ৬টা মহাদেশের ৪৮ টা দেশে কুমন লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়েকে তাদের স্কুলে এবং জীবনে সফলতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
যাই হোক, বছর কয়েক আগে আমার ছেলেকে নিয়ে গেলাম ওদের ওখানে ভর্তি করতে। অনেক শাখার মধ্যে আমি বেছে নিলাম টরন্টোর বে-ভিউ এবং কামার ইন্টারসেকশনের সেন্টারটিকে। সেটা আমার বাসা থেকে একটু দুর হলেও নিতে হলো কারন সেখানে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অর্থাত শনিবারেও সকাল ন’টা থেকে দুপুর দু’টা পর্যন্ত ক্লাসের ব্যবস্হা আছে। বাংলাদেশে আমি নিজে কিছুদিন ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম, তারপর জনগনের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করার সুবাদে আমার চোখে সবার আগে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোই চোখে পড়ে। ওদের দরজার সামনে যেয়েই সর্ব প্রথম আমার চোখে যেটা পড়লো তা হলো একটা সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চার তর্জনী উচু করে বিশালাকারের টাঙানো পোষ্টার, যার নীচে বড় বড় হরফে লেখা ‘আই ওয়ান্ট টু বি প্রাইম মিনিষ্টার অব কানাডা ওয়ান ডে’।
পোষ্টারটা দেখেই খুব ভালো লাগল। গনতান্ত্রিক সুসভ্য একটা দেশ এই কানাডা। এখানে ব্যাক্তিতন্ত্রের কোন স্হান নেই, পরিবারতন্ত্রের কোন জায়গা নেই। এক্স, ওয়াই, যেড যে কেউ কানাডার প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখতেই পারে। ভেতরে গিয়ে আরো অবাক হলাম, ওদের শেখানোর পদ্ধতি দেখে। অর্থাত ওরা বলতে চায় যে, যে কোন শিশুই আনলিমিটেড পটেনশিয়ালিটি নিয়ে জন্মায়, দরকার শুধু সেগুলোকে খুঁচিয়ে বের করে আনা। নীচে লিংক দিলাম, কেউ ইন্টারেস্টেড হলে ভিজিট করতে পারেন এবং বাংলাদেশেও এ ধরনের পদ্ধতি চালু করতে পারেন।
বাংলাদেশের বাক স্বর্বস্ব পলিটিশিয়ানরা দাবী করেন যে বাংলাদেশও একটা গনতান্ত্রিক দেশ। তাদের কাছে আমার প্রথম প্রশ্ন হলো তাহলে বুকে হাত দিয়ে বলেন, যদি পন্চগরের কিংবা গোয়ালন্দের অজ পাড়া গা’য়ের একজন কিশোর বা শিশু কে যদি বলা হয় বাবু, বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও? ওরা কি বুক ফুলিয়ে, নির্দ্বিধায়, নি:সংকোচে বলতে পারবে যে, বড় হয়ে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে চাই? আমরা নিজেরাও যখন ছাত্র ছিলাম, আমাদেরকে রচনা লিখতে হতো, ‘দ্যা এইম ইন লাইফ’। আমরা লিখতাম, বড় হয়ে আমি ডাক্তার বা ইন্জিনিয়ার হতে চাই। কারন, ডাক্তার হয়ে আমি জনসেবা করতে পারবো। আমরাও কখনো সাহস করে ঐ কথাটা বলতে পারি নি। কারন যে রাজনীতি করে তার রাজনীতিতে কর্তৃত্ব থাকে না। সবকিছু চলে সরাসরি রিমোট কন্ট্রোলে। তাহলে সেটাকে কি গনতন্ত্র বলে নাকি স্বৈরতন্ত্র বলে আমার মাথায় আসে না। এসবই চলছে একইভাবে সকল দলের রাজত্বে।

আজকে দু:খের সাথে আমাকে লিখতে হচ্ছে, যতবার পত্রিকার পাতা খুলি আর ঢাকার মেয়র হিসেবে জনাব আনিসুল হকের প্রার্থিতার খবরটা পড়ি, খুব ডিস্টার্বড বোধ করি। আবারো ভাবি যে আসলে খোলসটাই ভিন্ন, কিন্তু ভেতরের পদার্থটা একই।
কারন আমি সব সময় বলি ও বিশ্বাষ করি যে, কেউ একজন যখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে আর্মিতে ঢুকেন, তার একটা স্বপ্ন থাকে যে তিনি একদিন মেজর জেনারেল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল বা জেনারেল হবেন। কেউ যখন বিসিএস দিয়ে সহকারী সচিব বা সহকারী কমিশনার হন, তার চিন্তায় থাকে একদিন তিনি সচিব হবেন, বড় আমলা হবেন। কেউ যখন সহকারী অধ্যাপক বা সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকুরী পান তিনিও একদিন অধ্যাপক বা ভিসি হবেন বা নির্বাহী প্রকৌশলী ইত্যাদি হবেন বলে আশা করেন। যিনি ব্যাংকের জুনিয়র অফিসার হিসেবে ঢুকেন তার স্বপ্ন থাকে একদিন তিনি ব্যাংকের জিএম বা এমডি হবেন। স্কুলের সহকারী শিক্ষকও চিন্তা করে কবে তিনি প্রমোশন পেয়ে প্রধান শিক্ষক হবেন!
ঠিক তেমনী যিনি ছোটবেলা থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে হাতে খরি নেন, তারপরে ফুল টাইম পলিটিশিয়ান হন, কিংবা অন্য পেশার পাশাপাশি কোন এক থানা কমিটির প্রাথমিক সদস্য পদ নিয়ে রাজনীতি শুরু করেন, তারও তো স্বপ্ন থাকার কথা যে তিনি একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হবেন। নিদেন পক্ষে, মেয়র, চেয়ারম্যান, এমপি মন্ত্রী হবেন।
অথচ কি আশ্চার্য্য দেখুন, রাজনীতি শুরু করলেন আপনি, জেল জুলুম হুলিয়া নিলেন আপনি, বাড়ী ঘর টাকা পয়সা সম্পত্তির ক্ষতি হলো আপনার, আত্নীয় শত্রু হলো, ভাই আর ভাই রইলো না, বন্ধু আর বন্ধু থাকলো না, এসবই হলো আপনি রাজনীতি করতে এসেছেন বলে। মেধা থাকা সত্ত্বেও বৃত্তি নিয়ে বিদেশ গেলেন না, চাকুরি নিলেন না, জীবনে এত এত স্যাক্রিফাইস যার জন্য করলেন, যে দলের জন্য করলেন, যে নেতা বা নেত্রীর জন্য করলেন, জীবনের এক চরম সন্ধিক্ষণে এসে দেখলেন যে, আপনারই সেই প্রিয় নেতা, যাকে আপনি জীবন দিয়ে ভালবাসেন, যার নামে জিন্দাবাদ দিয়ে দিয়ে জীবন পার করে দিয়েছেন সেই তিনি আপনাকে বা দলের মধ্যে আপনারই কোন প্রতিদ্বন্দিকে বাদ দিয়ে বাইরে থেকে ধরে এনে কাউকে সেই মেয়র পদটা, এমপি পদটা, মন্ত্রি পদটা দিয়ে দিয়েছেন। কখনো সেটা দিচ্ছেন রিটায়ার্ড সচিবকে, কখনো রিটায়ার্ড জেনারেল সাহবেকে, কখনো কোন টাকা ওয়ালা ব্যবসায়ীকে! আপনি একেবারে ফক্কাস। তারপর আপনি অভিমান করলেন, গোস্বা হলো, আপনাকে ম্যানেজ করতে ডাকা হলো, দায়িত্ব দেয়া হলো সেই ভাড়াটে বা নব্য আমদানীকৃত প্রার্থীকে। বেশীর ভাগ সময় আপনি বিক্রি হলেন বা ম্যানেজড হলেন আপনার সারা জীবনের রক্তের ঘামের বিনিময়ে!
ব্যাক্তি আনিসুল সাহেবের প্রতি আমার কোন ক্ষোভ নেই। তিনি একজন অত্যন্ত সজ্জন মানুষ, বিটিভিতে উনার অনেক প্রেজেন্টেশন দেখেছি। ব্যবসায় খুব সফলতা পেয়েছেন, কিন্তু তিনিতো আওয়ামী লীগের কোন ত্যাগী নেতা নন। এমনকি দলের কোন প্রাথমিক সদস্য কিনা জানা নেই। কথা হলো, আপনি যেখানে শ্রম দিবেন সেখানে আপনার বা আপনার সহকর্মীর অধিকার থাকবে অন্য কারো নয়। শ্রম দিলেন একজন, কষ্ট করলেন একজন, আর ভোগ করবেন আর একজন সেটাতো হতে পারে না। তিনি ভাল মানুষ হতে পারেন, ভাল ব্যবসায়ী হতে পারেন কিন্তু ভাল রাজনীতিবিদ নাও হতে পারেন। মানুষের সাথে মিশে, দলীয় পোর্টফলিওতে অন্তত তিন বছর কাজ করে প্রমান করা দরকার ছিল যে হ্যা তিনি মানুষকে ভালবাসেন, মানুষের ধকল সহ্য করতে পারেন, ঠিক যেমনটা সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদা চালু করেছিলেন। আজ যদি কোন রাজনীতিবিদ বলেন যে আমাকে সচিব পদে বা সেনাবাহিনীর জেনারেল পদে নিয়োগ দেয়া হোক, সেটা কি সম্ভব? তাহলে উনারা জীবনে কখনো রাজনীতি না করেও কেন রাজনৈতিক পদ পদবী পাবেন আমার বোধগম্য নয়। সাথে সাথে এটাও বলি যে এখন যারা দলের পদে আছেন তাদের নৈতিকতা, যোগ্যতা কতখানি সেটা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহ আছে। যারা আছেন তাদের চেয়ে কি আনিসুল সাহেব অনেক ভালো নন? অবশ্যই তিনি ভালো। হয়তো যোগ্যও বটে। তিনি যদি দলের একজন সদস্য হয়ে কাজ শুরু করতেন, প্রতিদিন সাধারন খেটে খাওয়া মানুষের গা’য়ের ঘামের গন্ধ নেবার মানসিকতা অর্জন করতে পারতেন, যখন তখন, সকাল বিকাল রাত বিরাতে দরজায় খট খটানির শব্দ শুনার অভ্যাস অর্জন করতে পারতেন তাহলে নিশ্চয়ই তিনি বর্তমানে যারা আছেন তাদের থেকে শতগুন ভালো করতেন এটা জোর দিয়েই বলা যায়।
তা না করে, একই ঘটনা, একই কাহিনী দিয়ে, নকল করে করে সিনেমাগুলো বানাচ্ছেন, সামরিক জান্তার সময়ে, জোর করে নাম দেয়া গনতন্ত্রের সময়ে। জাপা, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, ইধারকা মাল ওধার, ওধারকা মাল ইধার, এই যা!
স্কারবোরো, কানাডা

