
ডাফেরিন মলের এক নিরিবিলি কোণায় বসে প্রতিদিন নীরবে কাজ করে যান আলাজার বেয়েন। ঝকঝকে শোরুম বা আধুনিক প্রযুক্তির কোনো প্রদর্শনী নয় তার কর্মস্থল একটি ছোট্ট জুতামেরামতের দোকান। প্রায় সিকি শতাব্দি ধরে, সপ্তাহের সাত দিনই তিনি এখানে দৈনিক প্রায় ১০ ঘণ্টা কাজ করছেন। কাজটি খুব আকর্ষণীয় না হলেও কানাডায় আসার পর এই পেশাই তাকে দিয়েছে জীবনের স্থিতিশীলতা ও আত্মসম্মান।
ইরিত্রিয়া বংশোদ্ভুত এই অভিবাসীর জীবন হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গত মাসে। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র প্যাচিং ও স্টিচিং মেশিনটি হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। এই যন্ত্র ছাড়া কার্যত তার কাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলাজার বেয়েন বলেন, “এই মেশিনটা ছিল আমার ডান হাত। ব্যাগের ছেঁড়া ফিতা ঠিক করা হোক, বুটের জিপার বদলানো হোক বা স্যান্ডালে ইলাস্টিক লাগানো সব ক্ষেত্রেই সেলাইয়ের দরকার হয়। মেশিন ছাড়া আমি এসব কাজ করতে পারি না।” ‘মানিজওয়ার্থ অ্যান্ড বেস্ট কোয়ালিটি শু রিপেয়ার’ নামের দোকানটির কর্ণধার বেয়েন জানান, তার ব্যবহৃত প্যাচিং মেশিনটির বয়স ৫০ বছরেরও বেশি। মন্ট্রিয়লভিত্তিক যে কোম্পানি এটি তৈরি করেছিল, তারা এখন আর কার্যক্রমে নেই। ফলে এই পুরোনো প্রযুক্তির যন্ত্র মেরামত করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিকল্প হিসেবে বেয়েন তার দোকানে কাটিং ও অন্যান্য সীমিত কাজের ওপর মনোযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তবে এতে তার বহু নিয়মিত গ্রাহককে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছিল, যা তাকে মানসিকভাবে ভীষণ কষ্ট দিচ্ছিল। ডাফেরিন মলের এই ছোট্ট দোকানটি কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং স্থানীয় মানুষের জন্য একটি নির্ভরতার জায়গা।
অনুগত গ্রাহক মার্শা সান্দু সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমি আমার জিপার ঠিক করতে এসেছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, তিনি এটা করতে পারবেন না। এরপর বললেন, নতুন মেশিন আনতে প্রায় ১০ হাজার ডলার লাগবে। তখনই আমি তাকে বলি আমি তাকে এই ১০ হাজার ডলার দিতে চাই।” তিনি আরও বলেন, “আমরা সবাই ডাফেরিন মলে থাকি। এখানে বহু মাল্টিমিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক কোম্পানি রয়েছে। তাই মনে হলো, কমিউনিটি যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তাহলে একজন পরিশ্রমী মানুষকে বাঁচানো সম্ভব।”
মার্শা সান্দুর উদ্যোগেই শুরু হয় একটি গো-ফান্ড-মি ক্যাম্পেইন। প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত সাড়া দেয় স্থানীয় মানুষ। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ভাঙা মেশিনটি মেরামত বা নতুন মেশিন কেনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় পুরো অর্থ সংগ্রহ হয়ে যায়।
এখন আলাজার বেয়েন অপেক্ষায় আছেন জার্মানি থেকে আসা একটি নতুন প্যাচিং মেশিনের। চোখে-মুখে তার স্বস্তি আর কৃতজ্ঞতা স্পষ্ট। তিনি বলেন “আমি কখনো ভাবিনি মানুষ এতটা পাশে দাঁড়াবে,”। “এই কমিউনিটি আমাকে শুধু কাজ নয়, পরিবারও দিয়েছে।”ডাফেরিন মলের এক কোণায় বসে থাকা এই মুচির গল্প প্রমাণ করে ব্যবসার আকার ছোট হতে পারে, কিন্তু মানবিক বন্ধন আর সহমর্মিতার শক্তি সীমাহীন।

