টরন্টোর জর্জব্রাউন কলেজের দিনগুলি

টরন্টোর জর্জব্রাউন কলেজের দিনগুলি - the Bengali Times
লেখক সৈয়দ আযম

টরন্টোর জর্জব্রাউন কলেজে দুই বছর মেয়াদী হেলথ্ ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ভর্তি হয়েছি।ক্যারিয়ার প্লান সব দেশেই এখন কঠিন। আমার এই নতুন দেশের প্রেক্ষাপটে আমাকেই আবার তৈরী হতে হবে। আমার শিক্ষাজীবনের সব সনদ এরা ভালোবাবে পরীক্ষা করে দেখে তারপর ভর্তি মন্জুর করেছে কতৃপক্ষ।

যে সকল বিষয়ে পড়ছি তার সবই মেডিকেল শিক্ষার সংক্ষিপ্ত রুপ।

- Advertisement -

সকাল ৬-৩০ মিনিটে বাসে উঠি এর পর সাবওয়ে ট্রেনে উঠি এবং ৪০ মিনিট পর আরো ১৫ মিনিট পথ হেঁঁটে কলেজে পৌছাই। এটা সপ্তাহের ৫ দিনের রুটিং।সন্ধা ৬ টায় বাসায় ফিরি।

আমার ক্লাসে দু’জন ভারতীয় ডাক্তার আমার সাথে। পড়ালেখ নিয়ে তাদের সাথে আমার নিত্য কথা হয়। তারা বয়সে তরুন কিন্তু বন্ধুর মতো। বাকীরা দু’একজন ব্যতীত সবাই আমার ছেলের বয়সী কাজেই কারো সাথে আমার কথা হয়না।প্রথম সারিতে বসি পিছু ফিরে আর দেখা হয়না। পেছনে যারা বসে তারা দুষ্টামী করে সামনে থেকে তা  বুঝতে পারি।

মাঝ বয়সী একজন আফ্রিকান মেয়ে একা বসে থাকে মাঝে মধ্যে অন্যদের হাসিতে সায় দেয় দেখি।একদিন ক্লাসে গ্রুপ করে দিল শিক্ষক। সবাই ভাগাভাগি হয়ে গেছে একা রইলাম আমি আর সেই মেয়েটি তার নাম মেলানি।

এই কোর্সে অল্প লেখা পড়া করেও আমি অনেক নম্বর পাই কারন সব আমার আগেই পড়া। এটা অন্যরা খেয়াল করছে তবু্‌ও গ্রুপের সময় আমি কাউকে পেলাম না।

মেলানি প্রায় সন্ধায় ফোন করে।তার উদ্দেশ্য আমার কাছ থেকে লেখাপড়ার তালিম নেয়া কারন ইতোমধ্যে সে বুঝতে পেরেছে যে আমার progress ভালো।আমি চেষ্টা করি তাকে সাহায্য করার।এক দিন সে বললো

-জানিস আমার হাজবেন্ড প্রায়ই আমাকে বলে-তুমি Syed কে কি পেয়েছো যে শুধু কল কর তাকে।

একথা বলে সে খিল খিল করে হাসে। ওর হাজবেন্ড ইন্জিনিয়ার। নতুন বিয়ে কোন সন্তান হয়নি।

একদিন দুপুরে কলেজের বারান্দায় কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় মেলানি বললো

-একটু নীচে চল আমার হাজবেন্ড এসেছে আমাকে নিতে।

নীচে এলাম। ওর হাজবেন্ড গাড়ী থেকে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়িয়েছে।আবহাওয়া ভালো শীত গরম কোনটিও নেই।আমরা পৌছাতেই মেলানি পরিচয় করিয়ে দিলো। কথাবাতার শেষে ইন্জিনিয়ার সাহেব বললেন

-তোমারা থাকো আমি আমার বউকে নিয়ে যাচ্ছি।

মনে মনে বললাম -তোমার বউ তুমিইতো নিয়ে যাবে। আমরা ক্লাসে ফিরে এলাম।

পর দিন মেলানি এসে কি খুশী। আমাকে বললো

-জানিস তোকে দেখে সে খুব খুশী।আমাকে বলেছে-একবার মানুষ দেখলে সে চিনতে পারে তাই তোকে সে চিনতে ভুল করেনি।তোর সম্পর্কে অনেক পজেটিভ মন্তব্য করেছে আমার কাছে।

আগের মতো মেলানি সন্ধায় প্রায়ই রিং করে। আমি একটু আধটু বিরক্ত হই কিন্তু কিছু বলিনা। আমাদের গ্রুপের লেখাপড়া ভালোই চলছে তবে এসাইনমেন্টের সব কাজই আমার একা করতে হয় আর সে ভাগ নেয়।

ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ক্রিষ্টমাসের ছুটি থাকে ২১-২২ দিন। তখন শীতও জাকিয়ে বসে পুরা কানাডাতে। একদিন সন্ধায় বাইরে এসেছি টরন্টোর বাঙ্গালী পাড়ায়।এখানে বাংলা পত্রিকা অফিসে বসে কবি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই।সে দিন তখনো পত্রিকা অফিসে পৌছাইনি হঠাৎ ফোনটা  বেজে উঠলো। হাতে প্লাভস ওটা খুলে পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা হাতে নিতে হবে। কে নেয়? বার কয়েক রিং শেষে বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিলাম।

মেলানি রিং করেছে।আমি ফোনটা ধরেই বকা শুরু করলাম।মেলানি চুপ, যেন ফোনের অপর প্রান্তে সে পাথর হয়ে গেছে।মনে হলো বেশি হয়ে গেল তাই পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বললাম

-জানিস আজ বাইরে অনেক ঠান্ডা।

অবাক করে দিয়ে মেলানি বললো

-সেটাই বলার জন্যইতো ফোন দিলাম, তা তুই গরম কাপড় পরে বেরিয়েছিসতো?

এবার আমার বোবা হওয়ার পালা।আমি কি বলবো উত্তরে? আমার দু’চোখ ভিজে এলো এই ভেবে যে একটা মানুষ আমার খোঁজ নিতে ফোন করলো আর আমি না শুনেই তার উপর রাগলাম, বকা দিলাম। গলার স্বর স্ভাবিক করে বললাম

-চিন্তা করিস না, ঠিক ঠাক মতো বেরিয়েছি।

কানাডা ঠান্ডার দেশ এখানে শীত বা ঠান্ডার হাত থেকে রক্ষা পেতে Layer by layer গরম কাপড় পরে বাইরে যাই।এখনো যখন শীতের সন্ধায় বাইরে যাই মেলানির কথা প্রায়ই মনে পড়ে। মেলানি হয়তো সেটা জানেনা।

 

ইয়েলোনাইফ, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles