
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাড়ি জমান কানাডা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হচ্ছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নীতিগত পরিবর্তন, শ্রমবাজারের মন্দাভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ বেড়েছে দৃশ্যমানভাবে।
কানাডা সরকার ২০২৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নতুন সীমা আরোপ করে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নতুন স্টাডি পারমিট অনুমোদন প্রায় ৩৫ শতাংশ কমানো হয় এবং ২০২৫ সালেও এই নীতি বহাল রয়েছে। দেশটির অভিবাসন সংস্থা ইমিগ্রেশান, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা (আইআরসিসি) জানিয়েছে, ২০২৩ সালে কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি ছিল।
নতুন শিক্ষার্থীর প্রবাহ কমলেও ইতোমধ্যে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরির প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার্থী সংখ্যা সীমিত করার লক্ষ্য ছিল আবাসন সংকট ও অবকাঠামোগত চাপ কমানো, তবে এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও।
২০২৫ সালের শুরুতে কানাডার যুব বেকারত্বের হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ আগের তুলনায় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিশেষ করে টরন্টো, ব্রাম্পটন, মিসিসাগা ও ভ্যাঙ্কুভার -এর মতো শহরগুলোতে রেস্টুরেন্ট, খুচরা দোকান ও সার্ভিস খাতে নিয়োগ কমে গেছে। ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ঐতিহ্যগত পার্ট-টাইম চাকরির সুযোগ এখন অনেকটাই সীমিত।
কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, কিছু এলাকায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কোনো না কোনো গিগ-ইকোনমি কাজে যুক্ত। অনেকেই রাইড-শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম যেমন উবার, উবার ইটস, ডোরড্যাশ ও স্কিপ দ্যা ডিসেস – এ কাজ করছেন। তবে এসব প্ল্যাটফর্মে আয় অনিয়মিত এবং জ্বালানি ও গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাদ দিলে প্রকৃত আয় অনেক কমে যায় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষা খরচও দ্রুত বেড়েছে।কানাডিয়ান ব্যুরো ফর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের গড় বার্ষিক টিউশন ফি ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কানাডিয়ান ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে বড় শহরগুলোতে মাসিক বাসাভাড়া ৮০০ থেকে ১,৫০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। খাদ্য, পরিবহন ও স্বাস্থ্যবিমা খরচ যোগ করলে মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে যায়। সপ্তাহে অনুমোদিত ২০ ঘণ্টা কাজ করেও অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে টিউশন ফি ও ভাড়া সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কেউ কেউ শিক্ষা ঋণ নিচ্ছেন, আবার অনেকে পরিবার থেকে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তা নিচ্ছেন। কিছু শিক্ষার্থী অতিরিক্ত সময় কাজের ঝুঁকিও নিচ্ছেন, যা তাদের পড়াশোনার ওপর প্রভাব ফেলছে।
পড়াশোনা শেষে কানাডায় থাকার সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। স্থায়ী বসবাসের পথ এখন আগের তুলনায় কঠোর এবং চাকরির বাজার ধীরগতির। ফলে অনেকেই ভাবছেন, ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর দেশে ফিরে যেতে হবে কি না। কমিউনিটি সংগঠকদের মতে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা কানাডার অর্থনীতিতে বছরে ২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখেন। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের আর্থিক ও মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রবিন হোসেন বেঙ্গলি টাইমসকে জানান, “কানাডায় আসার স্বপ্ন ছিল ভালো শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা মাস শেষে টিউশন ফি কীভাবে দেব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ না বাড়লে এই সংকট আগামী সময়েও অব্যাহত থাকতে পারে। নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ কীভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অবদান ও কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। কারণ শিক্ষা-অভিবাসন নীতির প্রতিটি পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনে এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়।

