মন্ট্রিয়লে উইকেন্ড মানেই বাংলাদেশি ঘরোয়া পার্টি, আড্ডা আর জমজমাট মিলনমেলা

মন্ট্রিয়লে উইকেন্ড মানেই বাংলাদেশি ঘরোয়া পার্টি, আড্ডা আর জমজমাট মিলনমেলা - the Bengali Times
মন্ট্রিয়লের একটি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায়

সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ততার পর শুক্রবার সন্ধ্যা নামতেই যেন বদলে যায় মন্ট্রিয়ল শহরের একাংশের আবহ। উত্তর আমেরিকার ফরাসিভাষী এই নগরীতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির কাছে উইকেন্ড মানেই আনন্দ, আড্ডা আর মিলনমেলার এক বিশেষ সময়। অনেকেই মজা করে বলেন, “মন্ট্রিয়লে শনি-রবি মানেই ছোট্ট বাংলাদেশ!”

২০২১ সালের আদমশুমারি তথ্য অনুযায়ী, মন্ট্রিয়লের গ্রেটার মন্ট্রিয়ল এলাকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৬৭৫ জন। ইউপিজি নর্থ আমেরিকা নামক এক সংগঠনের তথ্যমতে, কানাডাজুড়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ৭৫ হাজারের বেশি; অনানুষ্ঠানিক হিসাবে তা এক লাখ ছাড়িয়েছে বলেও ধারণা করা হয়।

- Advertisement -

মন্ট্রিয়লে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন পিনাকী দাশ। পিনাকি বললেন, মন্ট্রিয়লের সামগ্রিক জনসংখ্যার বড় একটি অংশই অভিবাসী পটভূমির। স্ট্যাটিসটিকস কানাডার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, মন্ট্রিয়ল শহরে দৃশ্যমান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১১ লক্ষেরও বেশি। ফলে এখানে কমিউনিটি-ভিত্তিক সামাজিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়াই স্বাভাবিক।

মন্ট্রিয়লে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর বেশিরভাগই সপ্তাহের পাঁচ দিন কর্মব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটান। কেউ আইটি পেশায়, কেউ স্বাস্থ্যসেবায়, কেউবা ছোট ব্যবসায় কিংবা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত। তবে উইকেন্ডে সামাজিক যোগাযোগই হয়ে ওঠে মানসিক প্রশান্তির প্রধান অবলম্বন।

মন্ট্রিয়লে উইকেন্ড মানেই বাংলাদেশি ঘরোয়া পার্টি, আড্ডা আর জমজমাট মিলনমেলা - the Bengali Times
পারিবারিক আয়োজনে এভাবেই চলে গান কিংবা কবিতা আবৃত্তি

বিশেষ করে পার্ক-এক্সটেনশন, কোট-ডেস-নেইগেস, লাসাল ও সেন্ট-লরেন্ট এলাকায় বাংলাদেশি পরিবারগুলোর নিয়মিত ঘরোয়া আয়োজন এখন এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে। কমিউনিটি সংগঠকদের ধারণা, এখানকার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পরিবার মাসে অন্তত একবার কোনো না কোনো সামাজিক দাওয়াত বা মিলনমেলায় অংশ নেয়।

একটি সাধারণ উইকেন্ড পার্টির চিত্র প্রায় একইরকম। রান্নাঘরে কাচ্চি বিরিয়ানি বা পোলাওয়ের সুবাস, টেবিলে ঘরে বানানো পিঠা কিংবা মিষ্টান্ন। কেউ গিটার হাতে পুরনো বাংলা গান ধরছেন, কেউ গল্পে মেতে উঠছেন দেশের স্মৃতিচারণে। শিশুদের দৌড়ঝাঁপ আর তরুণদের প্রাণবন্ত আড্ডায় মুহূর্তেই ঘর ভরে ওঠে হাসি-আনন্দে।

বড়রা চা-কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আলোচনা করেন চাকরি, বাসা বদল, স্কুল ভর্তি কিংবা অভিবাসন সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা। নতুন অভিবাসীদের জন্য এসব আড্ডা অনেক সময় সামাজিক সহায়তা নেটওয়ার্ক হিসেবেও কাজ করে। কোথায় ভালো কাজের সুযোগ, কোন এলাকায় ভাড়া তুলনামূলক কম, কোন স্কুলে ভর্তি সুবিধাজনক এসব তথ্যও বিনিময় হয় এই অনানুষ্ঠানিক জমায়েতে।

বাংলাদেশে ঈদ, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলার যে সংস্কৃতি ছিল, প্রবাসে তার শূন্যতা অনুভূত হয় গভীরভাবে। মন্ট্রিয়লের বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা মনে করেন, উইকেন্ডের এসব পার্টি সেই শূন্যতাকে অনেকটাই পূরণ করে। তরুণ প্রজন্মের জন্যও এসব আয়োজন হয়ে উঠছে সাংস্কৃতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বাংলা গান, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পারিবারিক পরিবেশের মাধ্যমে তারা নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে অভিবাসী জীবনের মধ্যেও জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকে থাকে শক্তভাবে।

মন্ট্রিয়লের শীতের তীব্রতা সবারই জানা। কমিউনিটি সদস্যদের একজন নাজমা আকতার, তিনি বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, শীত যতই কঠিন হোক, উইকেন্ডের দাওয়াত আর আড্ডা মনটা গরম রাখে।

বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসী জীবনে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনানুষ্ঠানিক পারিবারিক সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সামাজিক মেলামেশা মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মন্ট্রিয়লে বাংলাদেশি জীবনের আসল রঙ ফুটে ওঠে শুক্রবার সন্ধ্যার পর। কর্মব্যস্ততার ক্লান্তি পেছনে ফেলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা উইকেন্ডে গড়ে তোলেন এক টুকরো স্বদেশ যেখানে হাসি, গান, খাবার আর ভালোবাসায় জেগে থাকে ছোট্ট বাংলাদেশ।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles