রমজানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কানাডার মুসলিম সম্প্রদায়

রমজানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কানাডার মুসলিম সম্প্রদায় - the Bengali Times
প্রিয়জনদের মাঝে অনেকে পছন্দ করেন ইফতার বিতরণ করতে

পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে কানাডার মুসলিম সম্প্রদায়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি ও উচ্ছ্বাস। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও বড় শহর বিশেষ করে টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, অটোয়া ও ভ্যাঙ্কুভারে ইতোমধ্যে রমজানের আবহ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মসজিদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, তারাবির জামাতের প্রস্তুতি, সম্মিলিত ইফতার আয়োজন, দাতব্য কর্মসূচির পরিকল্পনা এবং পারিবারিক কেনাকাটায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মুসলিম পরিবারগুলো।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৯ শতাংশ। বর্তমানে ইসলাম খ্রিস্টধর্মের পর কানাডার দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। গত দুই দশকে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১ সালে যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় ২ শতাংশ, ২০২১ সালে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ৪.৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

- Advertisement -

জনসংখ্যাগত বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে কানাডার মুসলিম সমাজ তুলনামূলকভাবে তরুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৬.৩ শতাংশের বয়স ১৪ বছরের নিচে, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ফলে রমজান শুধু আধ্যাত্মিক চর্চার মাস নয়, বরং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তোলারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

মুসলিম জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ বড় শহরকেন্দ্রিক। গ্রেটার টরন্টো এলাকায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ এবং গ্রেটার মন্ট্রিয়লে প্রায় ৮.৭ শতাংশ মানুষ মুসলিম ধর্মাবলম্বী। এই ঘনত্বের কারণে রমজানের কার্যক্রম ও উদযাপন শহুরে জীবনের একটি দৃশ্যমান অংশে পরিণত হয়েছে।

রমজানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কানাডার মুসলিম সম্প্রদায় - the Bengali Times
রমজানে ইফতার পার্টি একটা বড় উদ্যোগ

বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারে ইতোমধ্যে তারাবির নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত এবং প্রতিদিনের সম্মিলিত ইফতারের আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধন শুরু করেছে, কারণ রমজান মাসে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ইফতার ও ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নেন।

রমজান মাসের অন্যতম প্রধান দিক হলো দান ও মানবিক সহায়তা। কানাডার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি, গৃহহীনদের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম ঘোষণা করেছে। শহরভিত্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে এসব উদ্যোগ নগর সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কমিউনিটি সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজান উপলক্ষে ‘ফুড ব্যাংক’ কার্যক্রম, কম আয়ের পরিবারের জন্য খাদ্য প্যাকেট বিতরণ এবং শরণার্থী সহায়তা কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে। এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও উপকৃত হন।

রমজান ঘিরে কানাডার খুচরা বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ সময় হালাল খাদ্যপণ্য, খেজুর, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং পোশাকের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দোকানগুলোতে কেনাকাটার চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেক দোকানে ইতোমধ্যে বিশেষ রমজান অফার ও ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। সুপারমার্কেটগুলোতে খেজুর, সামোসা, পকোড়া, সেহরির উপকরণ এবং ঈদ উপলক্ষে পোশাক ও উপহারের আলাদা কর্নার সাজানো হয়েছে।

রমজান উপলক্ষে ড্যানফোর্থ-লরেন্স এর দেশী রেস্টুরেন্ট বিশেষ আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। পিঠাঘর রেস্টুরেন্টের কর্ণধার শেখ রন্জু এই প্রতিবেদককে বলেন, রমজান কেবল রোজা ও নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক সংহতি এবং বহুসাংস্কৃতিক কানাডিয়ান সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিভিন্ন শহরে ‘ওপেন ইফতার’ আয়োজনের মাধ্যমে অন্যান্য ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা আন্তঃসম্প্রদায়িক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

দ্রুত বর্ধনশীল মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে কানাডায় রমজানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব প্রতি বছরই আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব, মানবিক সহায়তা এবং পারস্পরিক সম্মানের চর্চা এসব দিক মিলিয়ে রমজান এখন কানাডার বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles