
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ভিডিও ও ছবি দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যামে বিনিয়োগে কানাডিয়ানদের প্রলুব্ধ করার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ডব্লিউ৫–এর এক তদন্তে উঠে এসেছে, এই ধরনের অত্যাধুনিক প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কেউ কেউ তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।
ডব্লিউ৫–এর প্রতিবেদনে উঠে আসে অন্টারিওর মারখাম শহরের এক ৫১ বছর বয়সী নারীর হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, ক্রিপ্টোকারেন্সি স্ক্যামের মাধ্যমে তিনি প্রায় ১৭ লাখ ডলার হারিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছেন বলে জানান।
ডব্লিউ৫–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই নারী বলেন, “আমার হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। আমি বুঝতেই পারিনি যে যেটা দেখছিলাম, সেটাই ছিল একটি ভয়ংকর প্রতারণা।”
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে তিনি ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখেন। ভিডিওটিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের ইলোন মাস্ককে বলতে শোনা যাচ্ছিল, তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করলে খুব দ্রুত ধনী হওয়া সম্ভব। ভিডিওতে মাস্কের মুখভঙ্গি ও কণ্ঠস্বর এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে সেটিকে ভুয়া বলে সন্দেহ করার কোনো কারণ তিনি পাননি।
তবে তদন্তে জানা গেছে, এই ভিডিওটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। প্রতারকরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ইলোন মাস্কের মুখ ও কণ্ঠস্বর নকল করে ভিডিওটি তৈরি করেছিল। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এমনভাবে কণ্ঠস্বর বদলে দেওয়া হয়েছিল, যেন মনে হয় মাস্ক নিজেই একটি নির্দিষ্ট ক্রিপ্টো বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছেন।
ওই নারী জানান, ভিডিওতে বলা হয়েছিল মাত্র ২৫০ ডলার বিনিয়োগ করলেই প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ মিলবে এবং প্রতিদিন নিয়মিত আয় করা সম্ভব হবে। প্রলোভনে পড়ে তিনি ই-ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রথমে ২৫০ ডলার পাঠান। দুই দিন পরই তিনি বিনিয়োগের বিপরীতে ৩০ ডলার মুনাফা পান। তিনি বলেন, “এই সামান্য মুনাফাই আমাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করিয়ে দিয়েছিল। তখনই আমি ভাবলাম, এটি সত্যিই কাজ করছে।”
এই প্রাথমিক ‘লাভ’ ছিল প্রতারণার ফাঁদে ফেলার একটি কৌশল। এরপর প্রতারকরা তাকে বারবার বোঝাতে থাকে যত বেশি বিনিয়োগ করবেন, মুনাফাও তত বেশি হবে। ধীরে ধীরে তিনি আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন, তিনি একটি সুপরিকল্পিত স্ক্যামের শিকার হয়েছেন, কিন্তু ততক্ষণে তার প্রায় সব সঞ্চয় হাতছাড়া হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি এই ধরনের ‘ডিপফেক’ ভিডিও এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকল আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ডব্লিউ৫–এর তদন্ত সতর্ক করে বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যেকোনো বিনিয়োগ–সংক্রান্ত ভিডিও বা বিজ্ঞাপন যাচাই না করে বিশ্বাস করা এখন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন সুবিধা এনে দিচ্ছে, তেমনি অপরাধীরাও সেই প্রযুক্তিকেই ব্যবহার করছে নতুন ধরনের প্রতারণার অস্ত্র হিসেবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার এবং সন্দেহজনক প্রস্তাব দেখলে যাচাই ছাড়া অর্থ বিনিয়োগ না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

