
কানাডায় প্রথমবারের মতো ইহুদি নিধন (Holocaust) অস্বীকার ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা উস্কে দেওয়ার দায়ে একজন ব্যক্তিকে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। নর্থ বে’র বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী কেনেথ পলিনকে ১৮ সেপ্টেম্বর নয় মাসের কারাদণ্ড এবং দুই বছরের প্রবেশন দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটিতে নতুন আইনি নজির তৈরি হলো।
ক্রাউন প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পলিনের দেওয়া অসংখ্য পোস্ট শুধু ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষই ছড়ায়নি, বরং সহিংসতা উস্কে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক বক্তব্যে ভরা ছিল। দীর্ঘ সাত মাস তদন্তের পর গত জুনে নর্থ বে পুলিশ সার্ভিস তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো ও ইহুদি নিধন অস্বীকারের অভিযোগ আনে।
ফ্রেন্ডস অব সিমন ভাইজেন্থাল সেন্টারের দেওয়া তথ্যমতে, পলিন তার অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বারবার দাবি করতেন – ইহুদিরা নাকি “দানব”, তারা “মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণহত্যাকারী”, বৈশ্বিক সমস্যার জন্য “প্রত্যেক আমেরিকান ইহুদি দায়ী”, এবং বিশ্বের উন্নতির একমাত্র উপায় “ইহুদিবিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া”।
এছাড়া তিনি বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের ‘তাড়িয়ে দেওয়ার’ পক্ষে মত দেন এবং ইহুদি নিধনকে উপহাস বা অস্বীকার করে অসংখ্য পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করেন। তার কনটেন্টগুলোতে ছিল চরম ষড়যন্ত্র তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি, যা ইতিহাস বিকৃত করার পাশাপাশি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ঘৃণা উস্কে দিয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০২২ সালে কানাডা সরকার হলোকাস্ট অস্বীকারকে অপরাধ হিসেবে সংযোজন করে ফৌজদারি আইনে। কিন্তু বাস্তবে এ অপরাধে কারও বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ঘোষণার ঘটনা এবারই প্রথম। মানবাধিকার সংস্থা ও ইহুদি সংগঠনগুলো এই বিচারকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইনে ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তার এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এ রায় কানাডায় ঘৃণাজনিত অপরাধ মোকাবিলায় শক্ত বার্তা দেবে। বিশেষ করে সংগঠিত ভুল তথ্য ছড়ানো ও ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকারের বিরুদ্ধে এটি ‘নীতিগত অবস্থান’ প্রতিষ্ঠা করবে।
প্রসিকিউটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, পলিনের পোস্টগুলো শুধু ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং ইহুদিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার মতো বার্তা দিয়েছিল। আধুনিক সময়ে অনলাইন ঘৃণাচর্চা যে বাস্তব জগতেও বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে, এই মামলাটি তার বাস্তব উদাহরণ।
ইহুদি অধিকার সংস্থাগুলোর মতে, রায়টি শুধু একটি ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে নয় এটি কানাডায় বিস্তৃত হয়ে ওঠা অনলাইন ঘৃণাচর্চার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা। ভাইজেন্থাল সেন্টার এক বিবৃতিতে বলেছে, “ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করে ঘৃণা ছড়ানো কখনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আওতায় পড়ে না। বরং এটি সহিংসতা ও বিভক্তির জন্ম দেয়।”
কেনেথ পলিনের বিরুদ্ধে দেয়া এই দণ্ড কানাডায় ঘৃণাজনিত অপরাধের বিচারব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো মনে করছে এটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঘৃণা, বর্ণবাদ এবং হলোকাস্ট অস্বীকারের মতো বিপজ্জনক প্রবণতা দমনে একটি শক্ত নজির হয়ে থাকবে।

