
উত্তর আমেরিকার রাজনৈতিক বিভাজন বহু ইস্যুতে স্পষ্ট হলেও, এক ভয়ঙ্কর জীববৈজ্ঞানিক হুমকিকে কেন্দ্র করে অবশেষে একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে দেখা গেছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর ডেমোক্র্যাটিক প্রতিপক্ষ এবং কানাডীয় বিশেষজ্ঞদের। এই বিরল ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু এশিয়ান কার্প নামে পরিচিত এক আগ্রাসী প্রজাতির মাছ।
১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে আনা এই কার্প মূলত জলাশয়ের অতিরিক্ত শ্যাওলা ও অ্যালজি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিয়ম পাল্টানোর চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষই তৈরি করেছে নতুন সংকট। বন্যার সময় পুকুর ও চাষের ঘের থেকে বেরিয়ে এই কার্প ছড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নদী-হ্রদ ব্যবস্থায়, আর সেখান থেকে বর্তমানে তাদের বিস্তার যেন আর থামছেই না।
কানাডার ইনভেসিভ কার্প প্রোগ্রামের অ্যাকুয়াটিক বায়োলজিস্ট ট্রিসিয়াহ টুগাডে বলেন, “এরা সামনে যা পায় তাই খায় এমনকি আমরা ইলেক্ট্রিক মেশিন ব্যবহার করার সময়ও দেখেছি, তারা মেশিনের অংশ পর্যন্ত কামড়ে ধরে।” কার্প এক দিনে নিজের শরীরের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিমাণ খাদ্য খেতে পারে। ফলে তারা যেখানে যায়, সেখানকার পরিবেশগত ভারসাম্য একেবারে ওলট-পালট হয়ে যায় বিশেষ করে তৃণ-স্বল্প অগভীর পানিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় নদী বর্তমানে এশিয়ান কার্পের প্রধান বিস্তারের একটি কেন্দ্র। কিন্তু সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গা হলো যদি তারা গ্রেট লেকস অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বংশবিস্তার করতে শুরু করে, তবে কী বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের গ্রেট লেকস ওয়াটার পলিসি বিশেষজ্ঞ মাইক শ্রীবার্গ বলেন, “ইলিনয় নদীর এশিয়ান কার্প গ্রেট লেকসে ঢুকে গেলে কী হবে এই একটি বিষয় নিয়ে ইকোলজিস্টরা যতটা চিন্তিত, অন্য কোনো পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে তারা এতটা উদ্বিগ্ন নন।”
এই হুমকি এতটাই বড় যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিষয়টি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। তিনি কার্পকে জাতীয় সম্পদ ও বাণিজ্যিক মৎস্যসম্পদের জন্য “বাস্তব হুমকি” বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানও একই উত্তর আমেরিকার জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটি এখন অন্যতম অগ্রাধিকার।
উত্তর দিকের দেশ কানাডা বিশেষভাবে সতর্ক। গ্রেট লেকসের যে সব শাখা নদীতে এশিয়ান কার্প ডিম ছড়াতে পারে, সেসব জায়গায় প্রতি বছর খোঁজ ও নজরদারি চালায় কানাডীয় বিশেষজ্ঞরা।
টুগাডে ও সিনিয়র বায়োলজিস্ট অ্যালেক্স প্রাইস নেতৃত্ব দেন গ্র্যান্ড রিভারে পরিচালিত ‘ইলেক্ট্রোফিশিং’ অভিযানে যেখানে বিশেষ বিদ্যুতায়িত সরঞ্জাম দিয়ে কার্প শনাক্ত ও ধরে ফেলা হয়। ২০১২ সালে কানাডার এই নজরদারি কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন নদী থেকে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন আক্রমণাত্মক কার্প ধরা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন বর্তমান পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া না হলে একসময় এই মাছ গ্রেট লেকসকে এমনভাবে দখলে নিতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ আর থাকবে না।

