সোনালী সকাল

সোনালী সকাল - the Bengali Times
মম কাজী

জীবনের প্রেমে পড়ার একটা ব‍্যাপার আছে। এমন কিছু সকাল আসে যখন সূর্যের প্রথম রশ্মির সাথেই শুরু হয় প্রেম। হেমন্তের শীতল বাতাসে প্রায় লাল কমলা হয়ে যাওয়া গাছের পাতার ফাঁক ফোকড় দিয়ে চুইয়ে পড়া পেন্সিলের মতো সরু সোনালি রোদ ত্বকের উপরে এঁকে দেয় উষ্ণ অদৃশ্য উল্কি। সেদিনগুলো মন বড় উদাসীন হয়ে ওঠে, মর্ত‍্যের দৈনন্দিন জীবনের শত জরুরী কাজকেও তখন অর্থহীন বলে মনে হয়। সৃষ্টিকর্তার অতি যত্নে তৈরী এই পৃথিবীটা যে অফিস, কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইস এর স্ক্রিন, ক্লাসরুম কিংবা নিছক রান্নাঘরের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নয় একথাও নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। জীবনের প্রেম শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সময় ব‍্যাপারটা কেমন যেন ধীর লয়ে চলতে থাকে, হয়ত থেমেও যায় কিছুক্ষণের জন্যে। এই থেমে যাওয়া মুহূর্তগুলোই আসলে জীবনের প্রাপ্তি। জীবিত থাকার আনন্দ।বাকি সময় একটি জীবন্ত প্রাণ আর ভালো মানের চলন্ত মেশিনের মাঝে কি আর কোনও পার্থক্য থাকে?

এই যে থেমে যাওয়া অলস রোমান্টিক সকাল, যেদিন সকালের কফির কাপ পুরোটা তিন চুমুকে ঢকঢক করে শেষ করে, ঝলসে যাওয়া জিহ্বা নিয়ে অফিস শুরু করার বদলে কফির কাপ হাতে নিয়ে প্রথমে সেই আধপোড়া ঘ্রাণে প্রথমে নাসিকারন্ধ্র এরপরে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ড হয়ে সমস্ত শরীরে একটা চনমনে আবেশের সন্চালন করে দেহমনকে চঞ্চল করে তোলা। অতঃপর সেই জাগ্রত দেহমনে কফির স্বাদ পাওয়ার একটু তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি করা এবং একটু চিনি ছড়িয়ে দুধেল কফির কাপের প্রথম চুমুক, প্রেমিকার আদরের চুম্বনের মতোই তৃপ্ত করে।কফি আর কফি থাকে না- ম‍্যাজিক হয়ে যায়। কফির পোড়াটে গন্ধ, ক্রিমের শৈশবের স্বাদ আর চিনির মিস্টতা এই তিনে মিলে যাকে বলে একদম হোলি ট্রিনিটি তৈরি করে। তা আপনি যে ধর্মই পালন করেন না কেন- এই হোলি ট্রিনিটি বড়ই উপাদেয় বস্তু। জীবনের সাথে প্রেম করার দিনের প্রথম দেখা – কিংবা ফার্স্ট ডেট, যেখানে সবই মধুময়।

- Advertisement -

এই সকালে স্পটিফাই এর প্লে লিস্টের প্রতিটি গানের সাথে মনের অজান্তেই নাচতে থাকে শরীর। অপূর্ব ভালোলাগা ছড়িয়ে যায় মন আকাশ জুড়ে। যদি ঘরের বাহিরে খোলা আকাশের নিচে যাওয়া যায় তবে মন সৌন্দর্য খুঁজে বের করে প্রতিটি ঘাস ফুল পাতার মাঝে। রাস্তার অজানা মানুষের সাথে সৌজন‍্যমূলক হাসি বিনিময় কিংবা অচেনা কুকুরটাকে ধরে একটু আদর। দুস্টু কাঠবিড়ালীর সাথে কথোপকথন কিংবা নিজের মাখন দিয়ে টোস্ট করা এভরিথিং বেগলের এক টুকরো শেয়ার করা ছোঁচা সীগাল গুলোর সাথে।

অন‍্যজীবনের সকল ব্যাস্ততা ভুলে এই সকালটিতে নিজেকে নিয়ে যাই লেকের পাড়ে, দুস্টু শিশুদের অকারণ পানির মাঝে পাথর ছোড়া কিংবা সুগার আর ক‍্যালরি কাউন্ট ভুলে ওয়াফেল কোন দিয়ে একটি আইসক্রিম কিনেই ফেলা। খেতে খেতে পানির পাশে বালুবেলায় হাঁটা- বাতাসের শীতল পরশ ত্বকে অনুভব করা আর একই সাথে রোদের চাদর জড়িয়ে একটুখানি উষ্ণতায় নিজেকে সেঁকে নেওয়া। ব্যাস্তসমস্ত মানুষের দ্রুত হেঁটে যাওয়ার দিকে করুনার চোখে তাকানো কিংবা হাঁটুর কাছে পা‍্যন্ট পরিহিত গন্জিকা সেবনরত তথাকথিত সদ‍্য কৈশর পেরুনো তরুনের চোরা চাহনি- সবই তো অসল জীবনের কথা বলে।

অন‍্যদিন যা চোখেই পড়ে না, আজকের এই ধীরলয়ের সকালটিতে সবই নিয়ে আসে চোখের সামনে। এই দিনগুলোতেই মনে হয় রবীন্দ্রনাথের পুরো জীবন হয়ত এমন দিন দিয়েই জোড়া ছিল। তা না হলে জগতের এত সৌন্দর্যের সন্ধান তিনি পেলেন কিভাবে? আমার অফিস করার দিনগুলোতে তো আমি মেজাজ খারাপ করা কাজ ছাড়া আর কিছু দেখি না।

সবই মনে করিয়ে দেয়- আরে… আমি তো এখনও বেঁচে আছি। জীবন আমাকে আজকেও এত আদর করে হেঁটে চলে খেলতে দিচ্ছে। একটি সুন্দর রোমান্টিক সকালের জন‍্য ‍যা কিছু প্রয়োজন, সবই তো পাচ্ছি। আমি তো আজকের মহারানী, আমাকে ঘিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ড। আমি আর জীবন, বর্তমান এবং উপস্থিতি, সুস্থতা এবং অনুপ্রেরণা এই সকল নিয়েই বেঁচে আছি।

বেঁচে থাকার জন্য- ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য- সবচেয়ে ভালো আয়েশী জীবন যাপনের জন্য এই অনুভূতির চেয়ে বেশি কি কিছু প্রয়োজন আছে?

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles