
কানাডা জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় এবং মানবাধিকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি ইরান সরকারের তিনজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে দেশে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। ইতিমধ্যে একজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, আর বাকি দুইজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
২০২২ সালে অটোয়া সরকার ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির অভিযোগ তুলে কঠোর নীতি গ্রহণ করে। ওই নীতি অনুযায়ী, ইরানের যেকোনো মন্ত্রী, সামরিক কমান্ডার, গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ সদস্য কানাডায় প্রবেশ করতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, যারা পূর্বে প্রবেশ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজ প্রোটেকশন অ্যাক্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি–এর মুখপাত্র জানিয়েছেন, কানাডা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে সীমান্তে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। কোনো যুদ্ধাপরাধে জড়িত ব্যক্তি যেন আশ্রয় না পান, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনা ও সহিংসতা বৃদ্ধির পর, কানাডায় প্রবেশের চেষ্টা করা বা ইতিমধ্যে অবস্থানরত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রোফাইল খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডা জানিয়েছে, ২০২৩ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১৭,৮০০ ভিসা আবেদন বিশেষভাবে যাচাই করা হয়েছে। আবেদনকারীর ইরান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ থাকায় এই অতিরিক্ত যাচাই করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ১৩১টি ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং ১১৫টি আবেদন এখনও তদন্তাধীন, যেগুলোর মধ্যে কিছু মামলায় শিগগিরই ফেরত পাঠানোর আদেশ জারি হতে পারে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কড়া নীতি আন্তর্জাতিক পরিসরে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে যুদ্ধাপরাধ, গণঅত্যাচার বা রাষ্ট্রীয় দমননীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা কানাডায় নিরাপদ আশ্রয় পাবেন না। এটি একদিকে সন্ত্রাসবাদের অর্থায়ন রোধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং পরিবারিক সংযোগ যথাযথভাবে বিবেচনা করা জরুরি। কারণ ফেরত পাঠানো হলে তারা নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু ভিসা বাতিল করাই যথেষ্ট নয়; কানাডায় প্রবেশ করা কর্মকর্তাদের মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি বা প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। এজন্য ফেডারেল সরকার উন্নত স্ক্রিনিং টুল ব্যবহার শুরু করেছে, যাতে সীমান্তে প্রবেশের সময় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের তাৎক্ষণিকভাবে আটকানো যায়।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র কানাডার নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকারের প্রতিফলন। কানাডা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের জন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে আশ্রয়ের জায়গা নেই। এই কঠোর নীতি কানাডার মানবাধিকার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে এবং বৈশ্বিক পরিসরে দায়বদ্ধতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

