কানাডা পোস্টের ইতিহাসে রেকর্ড লোকসান

কানাডা পোস্টের ইতিহাসে রেকর্ড লোকসান - the Bengali Times
কানাডার জাতীয় ডাক সেবা প্রতিষ্ঠান কানাডা পোস্ট ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক এপ্রিলজুন শেষ করেছে রেকর্ড পরিমাণ ক্ষতির মধ্য দিয়ে

কানাডার জাতীয় ডাক সেবা প্রতিষ্ঠান কানাডা পোস্ট ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিক (এপ্রিল–জুন) শেষ করেছে রেকর্ড পরিমাণ ক্ষতির মধ্য দিয়ে। আর্থিক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, এ সময় তাদের করপূর্ব লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪০৭ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার যা প্রতিষ্ঠানটির ১৫০ বছরের ইতিহাসে একক প্রান্তিকে সর্বোচ্চ। এক বছর আগের একই প্রান্তিকে ৪৬ মিলিয়ন ডলার মুনাফা করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এটি এক নাটকীয় পতন।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া শ্রমিক অসন্তোষের সরাসরি প্রভাবেই এই ক্ষতি। ইউনিয়নভুক্ত কর্মীদের আংশিক কর্মবিরতি ও ওভারটাইম বন্ধের কারণে গত বছরের ছুটির মৌসুমে পার্সেল ডেলিভারিতে বিশাল ধাক্কা লাগে। এই ধাক্কা দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কাটিয়ে ওঠা যায়নি, ফলে রাজস্বের মূল খাত পার্সেল ব্যবসা ১০ শতাংশের বেশি সঙ্কুচিত হয়েছে।

- Advertisement -

শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করছেন, বেতন কাঠামো, কাজের সময় ও কর্মপরিবেশে উন্নতির দাবি দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী ইতিমধ্যে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করে নতুন সমঝোতা চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছেন, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। ইউনিয়ন জানিয়েছে, ন্যায্য বেতন বৃদ্ধি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে তারা পূর্ণ সক্ষমতায় ডেলিভারি শুরু করবে।

কানাডা পোস্টের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ই-কমার্স খাতের দ্রুত পরিবর্তন। অ্যামাজনের মতো বেসরকারি জায়ান্টরা নিজস্ব ডেলিভারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং বড় শহরগুলোতে একই দিনে পণ্য সরবরাহের সুবিধা দিচ্ছে। তুলনায় কানাডা পোস্ট ব্যয়বহুল ও ধীরগতির অভিযোগে ভুগছে। ঐতিহ্যবাহী চিঠিপত্রের পরিমাণও বছর বছর কমছে, ফলে পার্সেল ব্যবসার ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনকোয়ারি কমিশনের এক পৃথক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার না এলে কানাডা পোস্ট কার্যত দেউলিয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় প্রান্তিকের লোকসান কোম্পানির চলতি বছরের মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেকের সমান, যা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই ক্ষতি শুধু কানাডা পোস্ট নয়, ফেডারেল অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করবে। সরকারকে যদি বড় অঙ্কের সাবসিডি বা পুনঃমূলধন বিনিয়োগ করতে হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা করদাতাদের ঘাড়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক ডেলিভারি সার্ভিস চালু, আধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম উন্নয়ন এবং পার্সেল রেট পুনর্বিবেচনা ছাড়া ঘাটতি মোকাবিলা কঠিন।

কানাডা পোস্ট জানিয়েছে, তারা খরচ কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নানা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেলিভারি রুট পুনর্গঠন, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মীদের সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টা। তবুও বিশ্লেষকদের মতে, কেবল খরচ কমানো যথেষ্ট নয়; সময়মতো বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

রেকর্ড লোকসানের খবর প্রকাশের পর সাধারণ গ্রাহকের মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই এখন বেসরকারি কুরিয়ার সেবার দিকে ঝুঁকছেন। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে সরকারি ডাকসেবা ক্রমশই বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কানাডা পোস্টের বর্তমান সংকট শুধুমাত্র সাময়িক আর্থিক ক্ষতির ফল নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক মডেলের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ই-কমার্সের দ্রুত বিস্তার, বেসরকারি প্রতিযোগীর চাপ, শ্রম সম্পর্কের টানাপোড়েন সব মিলিয়ে সরকারি ডাকসেবাকে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নিতে হবে। সময়মতো সঠিক সংস্কার না এলে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি আগামী কয়েক বছরে আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles