-13.8 C
Toronto
শনিবার, জানুয়ারী ২২, ২০২২

যুদ্ধের কথা মনে পড়ে

- Advertisement -
ফাইল ছবি

অফিস থেকে বাসায় ফিরে নিয়মমাফিক বিছানায় উঠে লেপের কর্তৃত্ব নিয়ে দখিনার সাথে কিছুক্ষন মারামারি করি। এরই মধ্যে গিন্নি চা নিয়ে হাজির। কম্পিউটারের সামনে বসা ছেলেটাকে বললাম- বিত্ত, ভালো দেখে একটা গান ছাড় দেখি!

যেন সে আমার এ কথাটা অপেক্ষায় ছিল। পিঙ্ক ফ্লয়েডের “On The Turning Away” ছেড়ে দিলো। গাড়ির মধ্যে গানটা দুই-তিনবার করে না শুনলে তার মন ভরে না। আমার যেমন হেমন্তের গলায় “ও আমার দেশের মাটি” গানটা কয়েকবার করে না শুনলে মন ভরে না। ফ্লয়েডের গান শেষে বলল, আব্বু গিটারটা কেমন লাগলো?
– অসাধারণ! আর লিরিক্স?
– পাগল বানায়ে দেয়!
– তুই কি জানিস, আমরা আগে কত কষ্ট করে ঢাকা থেকে গান রেকর্ড করে আনতাম? ‘সিং’ আর ‘রেইনবো’ নামে দুইটা দোকান ছিল এলিফ্যান্ট রোডে। সিডি থেকে খুব যত্ন করে রেকর্ড করে দিতো ক্যাসেট এ। তোর লিস্টে আরেকটা গান ঢুকা- লাস্ট নাইট। [আমি প্রায় প্রতিদিনই তার লিস্টে কিছু বেস্ট গান ঢুকিয়ে দেই]
– কার?
– ক্রিস ডি বার্গ এর।
গানটা সার্চ দিয়ে মনযোগ দিয়ে শুনে জিজ্ঞেস করল, আব্বু গানটা কিসের ওপর?
– যুদ্ধের
– একটু এক্সপ্লেইন করবা?
তাকে বলতে থাকি-
গানটার দুইটা পার্ট আছে। প্রথম অংশে সৈন্যরা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছে বিজয়ের বেশে। শহরের মেয়র তাদের সম্মানে বক্তৃতা দিচ্ছে, সেলিব্রেশন চলছে। সৈন্যরা নাচছে, গাইছে আর বলছে তারা ঠিক আগের মতই আছে, একটুও বদলায়নি; বদলাবেও না। তারা নাকি যুদ্ধক্ষেত্রেও রাজার হালে ছিল, কারণ সৃষ্টিকর্তা তাদের সাথে ছিল।

- Advertisement -

কিন্তু গানটার দ্বিতীয় অংশ নিয়ে গেলো শহরের আরেক প্রান্তে। সেখানে কালো কাপড় পরিহিতা এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে; কখন তার ছেলেটা ফিরবে। হঠাৎ এক সৈন্য তার হাতে তার ছেলের ছবিটা দিতেই সে নিষ্পলক চেয়ে থেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো। ছেলেটা আর ফিরবে না। যুদ্ধ থেকে সবাইতো আর ফিরে না
– খুব স্যাড আব্বু
– যারা ভিক্টিমস, শুধু তারাই জানে স্বজন হারানোর কষ্ট। অথচ দেখ, যারা বেঁচে ফিরেছে তারা সেলিব্রেশন করছে!
– আব্বু, গানটা মনে হয় তোমার মুখে আগে অনেক শুনছি তাই না?
বাংলাদেশের যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। সাবিনা ইয়াসমিনের “সেই রেল লাইনের ধারে মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে” গানটার অনুরূপ। তার খোকা কি ফিরবে? না কি ফিরবে না? কী এক অসহ্য যন্ত্রনা! কত মা ছেলের পথ চেয়ে ছিল? হয়তো এখনো পথ চেয়ে আছে? কিংবা কোনো বোন তার ভাইয়ের জন্য?

মানুষ জন্ম থেকে আমৃত্যু গান শুনে যায়। জন্মের পর মা গুনগুন করে গান ধরে- “খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো”। গানই সম্ভবত একমাত্র জিনিস, যা মানুষের সুখের সঙ্গী আবার দুঃখেরও। একাকিত্ব, নির্জনতারও। এজন্যই মানুষ গায়ক গায়িকাদের এতো ভক্তি করে। মানুষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায় l

আমার জীবনেও রবীন্দ্রসংগীত, ব্রুস স্প্রিংস্টিন, ডায়ার স্ট্রেইটস, ক্রিস রিয়া, পিঙ্ক ফ্লয়েড কিংবা এবা তৈরী করে দিয়েছে নিজস্ব সুখ-দুঃখের ভুবন। যেখানে ইচ্ছে করলেই ঢুকে লেপ মুড়ি দিয়ে, ঘাপটি মেরে থাকতে পারি। মাতৃ জঠরের মতো।
বাচ্চা দুটোর বয়সের সাথে তাদের পছন্দ, অপছন্দও চেঞ্জ হচ্ছে। ঘুরে ফিরে তারা শেষ পর্যন্ত সেই সত্তর, আশি বা নব্বই দশকের গানগুলোকেই গ্রহণ করেছে কেন? পারিবারিক প্রভাব? কিছুদিন এক নাগাড়ে চলল ব্রুস স্প্রিংস্টিন। এখন চলছে গানস এন’ রোজেস। পাগলের মতো শুনছে নভেম্বর রেইন, এস্ট্রেঞ্জড কিংবা ডোন্ট ইউ ক্রাই। মুগ্ধ হয়ে শুনছে স্ল্যাশ এর গিটার। মেয়েটাও বিত্তর সাথে

গলা মিলিয়ে গেয়ে চলেছে –
“ডোন্ট ইউ ক্রাই টুনাইট,
আই ষ্টীল লাভ ইউ বেইবে।
ডোন্ট ইউ ক্রাই টুনাইট..
ও ও.. দেয়ার’জ এ হ্যাভেন এবোভ ইউ বেইবে!”
আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি তাদের দ্বৈত কন্ঠের সংগীত।

তারা আসলেই বড় হয়ে যাচ্ছে! বড়দের গান পছন্দ করা ধরেছে। গানের জগৎ তাদের জীবনও পাল্টে দিচ্ছে আস্তে আস্তে..। আমার জীবনটাও অনেক পাল্টে দিয়েছে।
কি ক্ষমতাধর এই গান!

অটোয়া,কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles