
কানাডা জুড়ে শুরু হয়েছে ডাক ও পার্সেল খাতে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা। ২০২৪ সালের নভেম্বরের শুরুতেই কানাডা পোস্টের প্রায় ৫৪,০০০ কর্মীর সর্বাত্মক ধর্মঘট ঘোষণার পর পুরো দেশজুড়ে ডাক ও পার্সেল পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে এক কোটি চিঠি, বিল ও পার্সেল আদান-প্রদানের ওপর নির্ভরশীল কানাডার মতো বিশাল ভূখণ্ডে এই ধর্মঘট সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
ডাককর্মীদের ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বহুদিন ধরে তারা মজুরি বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত কর্মী নিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু একাধিক আলোচনার পরও সন্তোষজনক সমাধান না আসায় শেষ পর্যন্ত তারা দেশব্যাপী ধর্মঘটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইউনিয়নের এক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বেঙ্গলি টাইমসকে বলেন, “আমাদের কর্মীরা প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করছে। তবুও মজুরি বাড়েনি। নিরাপত্তাহীনতার কারণে দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। আমরা কোনো বিলাসী দাবি করছি না আমরা চাই একটি ন্যায্য চুক্তি, যা আমাদের শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করবে।”
ধর্মঘট শুরু হতেই টরন্টো, মন্ট্রিয়ল, ভ্যাঙ্কুভার এবং অটোয়ার মতো প্রধান শহরগুলোতে ডাকঘরের সামনে কর্মীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে পিকেটিং শুরু করে।
এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত চিঠি-পত্র বা পার্সেলই নয়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, ব্যবসায়িক চালান, এমনকি জীবনরক্ষাকারী ঔষধপত্রের সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষ করে কানাডার গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। অনেক এলাকায় ডাক ও পার্সেল সেবাই দৈনন্দিন জীবনের প্রধান নির্ভরতা, যা বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রতিদিনের পার্সেল ও চিঠি সরবরাহে বিলম্বের কারণে কানাডার ব্যবসায়িক খাত প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ই-কমার্স কোম্পানি ও ছোট ব্যবসায়ীরা এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্টারিওর এক ছোট ব্যবসায়ী বলেন, “আমাদের পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ডাক সেবার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায়। এখন সব কিছু বন্ধ। এভাবে যদি চলতে থাকে, আমাদের বিক্রি অর্ধেকে নেমে আসবে।”
সরকার দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। শ্রমমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা চাই না কানাডার জনগণ এই ধর্মঘটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ুক। ইউনিয়ন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি বৈঠক চলছে। সমাধান দ্রুত বের করার চেষ্টা করছি।”
তবে ইউনিয়ন জানিয়েছে, তাদের সব দাবিতে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি না এলে ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। এই অবস্থায় সমঝোতার পথ যতদিন না খুলছে, ততদিন প্রতিদিনই নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সাধারণ নাগরিকরাও ক্ষোভ ও অসহায়তার কথা জানাচ্ছেন। টরন্টোর এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলের ওষুধ ডাকযোগে আসার কথা ছিল। এখন জানি না কখন হাতে পাব।”
ভ্যাঙ্কুভারের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী জানান, “আমি রেজিস্ট্রেশনের কাগজ ডাকযোগে পাঠাতে পারছি না। এতে আমার ভর্তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।”
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কানাডা পোস্ট ২.৩ বিলিয়নেরও বেশি চিঠি ও পার্সেল বিতরণ করেছিল। ২০২৪ সালে অনলাইন বাণিজ্যের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে এই সংখ্যা আরও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু চলমান ধর্মঘট সেই প্রবৃদ্ধিকে হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে।
কানাডার ডাকসেবা শুধু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ নয়, এটি সামাজিক সংযোগ ও যোগাযোগের এক ঐতিহাসিক মাধ্যম। বিশেষ করে তীব্র শীতকালে যখন পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, তখন ডাকসেবাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেয়।
নাগরিকদের অনেকেই বেঙ্গলি টাইমসকে জানান, কানাডা পোস্টের এই ধর্মঘট কেবল একটি শ্রমবিরোধ নয়, এটি এখন দেশব্যাপী অর্থনৈতিক ও মানবিক সঙ্কটের রূপ নিচ্ছে। ব্যবসায়ী, নাগরিক, শিক্ষার্থী সবাই এখন তাকিয়ে আছে সরকার, ইউনিয়ন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের আলোচনার টেবিলের দিকে।
যতদিন না এই বিরোধের সমাধান হচ্ছে, ততদিন কানাডাজুড়ে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।

