26.6 C
Toronto
রবিবার, জুলাই ২১, ২০২৪

মাওয়াই দ্বীপ – চার

মাওয়াই দ্বীপ - চার
মাওয়াই দ্বীপ

আবার উঠে গেলাম সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে । ওপর থেকে আকাশটাকে বড় কাছে মনে হলো। আকাশে আজ ছোপ মেঘ জমেছে। মনে মনে ভাবলাম পাহাড়ের এই সবুজ বনরাজির মেলায় যদি বর্ষা নামে কেমন লাগবে? তখন বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে ঝরনাও কি তার সবটুকু মাধুরী ঢেলে নতুন সুরে গান গাইবে ? হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত চিন্তা আমার মাথায় বিদ্যুতের মতো খেলে গেলো । সর্গের বর্ণনায় আছে, ঝর্ণার পানি, ফলের বাগান, হাত বাড়িয়েই ফল পাড়া যাবে, স্বচ্ছ সরোবর । তাতে সাদা হাঁস ভেসে বেড়াবে , সবুজ ঘাস থাকবে মখমলের মতো বিছানো, নানা রঙের ফুলের রাশি। আরো অনেক অনেক লোভনীয় সৌন্দয্যর বর্ণনা। তার সব কিছুই আমার মোটা মুটি দেখা হয়ে গেছে মাওয়াই দ্বীপে এসে।এবং পৃথিবীর। নানা দেশে ঘুরে। আমি যদি কোনো ভাল কর্মের জন্য স্বর্গের দ্বার প্রান্তে মোটা মুটি পৌঁছে যেতে পারি তাহলে নতুন কি জিনিস দেখে আমি বিস্মিত হবো ? হয়তো হুর বা হুরিদের ভিড় দেখে যা এখানে দেখতে পাচ্ছি না। এখানে শুধু মানব মানবীর ভিড় ।

বেহেস্তের কথাটা লিখতে গিয়ে একটা মজার কথা মনে পড়ে গেলো । আমার বোন এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে ক্যানাডাতে বেড়াতে । আমার ফলের বাগানের পাশে বসে চা খেতে খেতে দেখছিলেন গাছের নিচে পরে থাকা অসংখ্য আপেল, চেরি পিচ পেয়ার পরে আছে খাবার মানুষ নেই। তখন আমার বোন মজা করে বলেছিলো , তুই যদি কোনো ভাবে বেহেস্তে চলে যাস তখনতো তোর এসব ফল খেতে মনই চাইবে না। পৃথিবীতেই তো ফেলে ঝুলে এসব খাচ্ছিস । তখন কি খাবি? আমার বোনের কথা নিয়ে সেদিন আমরা খুব হাসাহাসি করেছিলাম। লিখতে বসলে কতো স্মৃতি এসে মনে ভীর করে।

- Advertisement -

এখন আবার ফিরে যাই মুল লেখাতে। আমার স্বামী এক মুহূর্তের জন্যও তার হাত থেকে মানচিত্র নামাতে পারেনি। কোণ দর্শনীও জিনিস দেখা বাকি থেকে গেলো সে চিন্তায় সে সর্বক্ষণ ব্যস্ত । দুচোখ ভরে, দু’ হাতের মুঠো ভর্তি করে ও নিয়ে যাবে সব অভিজ্ঞতা । কোনোটা যদি হাত ফসকে বেরিয়ে যায় তাহলে তার ভ্রমণটাই মাটি ।

‘ লাওয়াই সো ‘। পর্যটকদের একটি আকর্ষণীও সো । সমুদের তীরে বিশাল এলাকা জুড়ে সাজানো হয়েছে প্রদশনীর জন্য। সুন্দর করে সুসজ্জিত ভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চেয়ার টেবিল । তার সামনে সাজানো আছে বিশাল মঞ্চ । মঞ্চের এক পাশে দাঁড়িয়ে যন্ত্র শিল্পীরা বাজিয়ে যাচ্ছে হাওইয়ান গানের সুর। সেখানে পৌঁছানোর সাথে সাথে কাঁচা ফুলের মালা পরিয়ে এক সুন্দরী তরুণী দর্শকদের বরন করে নিচ্ছে। চারিদিক ভরে ছোট ছোট দোকান বসেছে নানা জিনিসের । স্থানীও নানা জিনিস বিক্রি হচ্ছে সেখানে। আমি আমার স্বভাব জনিত কারনে নানা রকম জিনিস কিনে ব্যগ ভর্তি করলাম। প্রদর্শনীর আগে পরিবেশন করা হোলো রাতের খাবার। নানা রকম খাবারে পরিপূর্ণ টেবিলের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। আরেক প্রান্তে নানা রকমের সুস্বাদু মিষ্টান্ন । আয়োজকদের আতিথেয়তায় কোন কর্পোন্য নেই। খাবারের পর শুরু হলো প্রদর্শনী । হাওয়াইয়ান ছেলে মেয়েরা গান করলো । নাচলো তাদের নিজের ভাষায় নিজেদের কায়দায় । নাচ গানের মাঝে ফুটিয়ে তোলা হলো তাদের নানা রকম পৌরাণিক কাহিনী । আগুন নিয়ে অত্যান্ত ভয়ঙ্কর উত্তেজনা মুলক নৃত্য পরিবেশন করা হলো । পুরো অনুষ্ঠান জুরেই ছিলো নানা রকমের আনন্দ ও উত্তেজনা। অনুষ্ঠান শেষে বেশ রাত করেই খুশি খুশি মন নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

ভ্রমনের দিন শেষ হওয়ার সময় এসে গেলো । আর তিন দিন আমরা আছি এখানে। ভাবছি কোনো আকর্ষণীও জিনিস কি বাদ পড়ে গেলো দেখা থেকে ? আজ গেলাম এগ্রিকালচারাল ফার্ম ‘ কুমুতে’ । ঢুকেই বিশাল শোরুম । নানা রকম চোখ জুড়ানো পেইন্টিং, নানা ফ্যাশনের স্থানীয় কাপড়- চোপড়, গহনা দিয়ে সাজানো শোরুমটি । জিনিস পত্র কিছুক্ষণ নাড়া চাড়া করে ঘুরে ফিরে দেখলাম শো রুমটি । সেখান বেরিয়ে ঢুকলাম ফার্মে । কোনো এক শিল্পী যেনো তার মনের সব আবেগ অনুভূতি দিয়ে নিখুঁত ভাবে সাজিয়েছেন এলাকাটিকে ।

কোথাও একটুখানি অগুছালো ভাব নেই। কিছুটা পথ যাওয়ার পরে দেখলাম একজন হাওয়াইয়ান লোক বড় বড় তিনটি গাছের মাঝ খানে শ্যামল ছায়ায় শান্তির নীড় বানিয়ে একটা টেবিলে নানা রকমের সামুদ্রিক গহনা সাজিয়ে বসে আছে। আমার স্বভাবসুলভ কারনে এগিয়ে গেলাম লোকটির কাছে একটু গল্প করার উদ্দেশ্যে । ‘ পড়তো পড় মালির ঘারে’ । জানলাম লোকটির নাম ‘কুনান’। কুনানের গল্পের আর শেষ নেই। কোনো ভাবেই তার গল্পের মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। আমার স্বামী একজন শিক্ষক জেনে কুনানের উত্তেজনার শেষ নেই , তারপর আবার ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষায় শিক্ষিত । তার বিজ্ঞান সম্পর্কে যতকিছু জানার আজই জেনে ফেলতে হবে। তার দুঃখ- কষ্টের কথাও আমাদের জানতে হলো । কতো কষ্ট করে তার দরিদ্র পিতা তিন ভাই দুই বোনকে বড় করেছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তার বাবা পয়সার অভাবে তাদের বেশী পড়াশুনা করাতে পারেনি। তাদের নেমে যেতে হয়েছে পয়সা রোজগারের জন্য বাবার সাথে। এখনো সে দরিদ্রই আছে। কিন্তু তারপরও সে তার ছেলে মেয়েদের পড়াশুনা করাবে।

কুনানের দুঃখ- কষ্টের কথা আর শেষ হবার নয়। এদিকে আমাদের সময়ের অভাব। যতোটা সময় পাই একটু ভালো করেই দেখতে চাই। কুনানের সঙ্গে কিছু ছবি তুলে তার কাছ থেকে একটা আংটি কিনে বিদায় নিলাম। কষ্ট লাগলো ভেবে আমেরিকার মতো জায়গাতেও কুনান পয়সার অভাবে পড়া শুনা শেষ করতে পারলো না। আরেকটু ভেতরে যেতেই চোখে পড়লো পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য শেড দিয়ে সুন্দর একটি জায়গা তৈরি করা হয়েছে। শেডের বাইরে ও ভেতরে সুন্দর করে সাজানো আছে টেবিল চেয়ার। একজন সুশ্রী মেয়ে ডাব বিক্রি করছে। ডাব কেটে স্ট্র লাগিয়ে দিচ্ছে। ডাবের পানি খাওয়া হলে ডাবটা কেটে ডাবের খোসা দিয়ে চামচ বানিয়ে ডাবের শাঁস খেতে দিচ্ছে। আমরা খুব আনন্দ করে ডাবের পানি ও শাঁস খেলাম। পাশে বিক্রি হচ্ছে ফ্রেশ ফলের রস। যারা যে ফলের রস খেতে চাচ্ছে তাদের তখনই তা বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। একটু ভেতরেই একটা পুকুর। পুকুরের টল মলে সচ্ছ পানিতে বেড়াচ্ছে হাঁস। পুকুরের তীরে একটা নৌকা বাধা। কেউ যদি নৌকা নিয়ে ভেসে বেড়াতে চায় সে উদ্দেশ্যে । পুকুরের চারপাশে চেনা অচেনা অপূর্ব সুন্দর সব গাছের সমারোহ ।

আমার মুগ্ধতা অনেক দূর আকাশের কাছা কাছি চলে গেলো । ধীরগতি ট্যুর বাসে উঠে ঘুরে দেখলাম পুরো এলাকাটা । নানা রকমের সবজি ও ফল রোপণ করা হয়েছে বিশাল এলাকা জুড়ে । বাসের মহিলা চালক বর্ণনা দিয়ে গেলো নানা রকমের গাছ সম্পর্কে । অবশেষে আমাদের কফি বাগানে নামিয়ে দিলো ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। প্রতিদিন কফি খাই কিন্তু কফি বাগান তো কোন দিন দেখিনি। খুব উৎসাহ নিয়ে আমরা কফি বাগানে ঘুরা ঘুরি করলাম সবাই মিলে। পুরো ‘কুমু’ বাগানটা পরিদর্শন করে একটা নতুন ধরনের পরিতৃপ্তি নিয়ে ফিরে এলাম।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles