32.2 C
Toronto
বুধবার, জুন ১৯, ২০২৪

নৌকা ডুবি

নৌকা ডুবি

ক্লিন্টন শহরে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষা দিয়ে তিন ঘন্টা জার্নি করে দুপুর একটায় টরন্টো ফিরে বন্ধুর বাসায় পৌঁছে দেখি সে নাই। ফোন দিলাম- দোস্ত তুই কই?
– কিংস্টোন, ক্যা?
– আমি তোর বাসায়
– আমার যে ফিরতে রাত হবে? বাসায় ঢোক; পাসওয়ার্ড ৪২০..
আমি কোড দিয়ে ঘরে ঢুকলাম।
ড্রাইভিং পরীক্ষার হাত থেকে কবে যে রেহাই পাবো খোদা জানে।
কিছুক্ষনের মধ্যে তার ফোন- রিপন তুই কি ক্লিন্টন থেকে আসলি?
– হু
– দাঁড়া, এবার আমি তোকে পাশ করাবোই। তিনটা লেসন দিবো। তুই যদি পাশ না করছিস, আমার নামে বিলাই পুষিস! খিদে লাগছে?
– হু
– ইশ! এক কাজ কর; ফ্রিজে কাঁচের বক্সে আটা মাখানো আছে, গোল বল করাই আছে। রুটি মেকারে ছেড়ে দিয়ে রুটি বানায়ে ফেল। আরেক বক্সে গরু ভুনা, মদিনা গ্রীলের। সাথে ডিম পোচ দিয়ে হবে না?
– আলবৎ!
– এসি বাড়ায়ে দে। ফ্রিজে স্টার বাকস এর কাঁচের বোতলের কাপুচিনো কফি বরফ কিউব দিয়ে খেয়ে ঘুম দে। ফেল করে মন খারাপ করবি না। কপালের লিখন মোছার উপায় নাই। তাছাড়া তোর জি-২ লাইসেন্স দিয়ে তো চলছেই। শুধু ভোর রাতে চালানোর নিয়ম নাই। মাঝরাতে কিডা গাড়ি চালায়?
তার কথা মতো ইলেকট্রিক রুটি মেকারে রুটি বানাতে দিলাম। ছোটখাটো ফ্রিজের সমান। আওয়াজ একটু বেশি, কিন্তু চমৎকার কাজের। একটু মোটা, তবে নিখুঁত গোল।

- Advertisement -

মানুষটা আসলে দয়ার সমুদ্র।
আমরা শুধু তার বাইরের সিংহটাকেই দেখি, ভেতরের খরগোশটা দেখি না। মনটা তার কখনো ঠান্ডা বরফ, কখনো গরম লাভা, আর কখনো হালকা কুয়াশার বাষ্প। আমার যে খিদে লাগছে, সেটা সে দুশো কিলোমিটার দূর থেকে কীভাবে বুঝলো? গরম রুটির সাথে গরু ভুনা পেয়ে আমার চোখ আবেগে ভিজে উঠলো। তিনটা একস্ট্রা লার্জ সাইজের ডিম পোচ নিয়ে বসে গেলাম। তাকে আগে কতো গালিগালাজ যে করছি না বুঝে..। নিজেকে ধিক্কার দিলাম, ছি!

প্রায় ঘন্টা দুয়েক ঘুমিয়েছি স্বর্গে, দশ হাজার ডলার দামের ম্যাট্রেস! আবার তার ফোন- রিপন তুই ঘুম?
– এই একটু..
– তোর বিকালে অটোয়া রওনা দেওয়া কি খুব আর্জেন্ট?
– বেশি না
– বাদ দে। রাতে আমার কলিগরা আসতেছে। হেভি খাইদাই হবে। তুইও আমাদের সাথে খাবি
– ওকে
– খুব জরুরি মিটিং। এবারের প্রজেক্ট বিরাট এলাকায় টাউনহাউজ প্রকল্প। তিনশো মিলিয়ন ডলার ইনভেস্টমেন্ট। হাত ছাড়া করা যাবে না। ফ্রিজ থেকে গরু লিখা বড় প্যাকেটটা বের করে ভিজায়ে রাখ। কালা ভুনা করে ফেলিস। রাত আটটার দিকে ভাত চুলায় দিস চার পট। আমরা মোট ছয় জন। পারলে সালাদ বানাস। মাছ ভাজতে পারিস?
– পারি
– তাইলে ইলিশের প্যাকেটও বের কর। জাস্ট হালকা মশলা মাখায়ে মেরিনেড করে সর্ষে তেল দিয়ে ভেজে ফেলবি, রান্না করা দরকার নাই। ডাল পারিস না?
– মোটামুটি
– মোটামুটি পারলে হবে না। সেদ্ধ করে ফেল হলুদ, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচামরিচ আর লবন দিয়ে। আমি এসে বাগাড় দিবো। বেগুন চাক ভাজা তো পারিস..
– হু
– গুড! আমরা রাত নয়টার মধ্যে ইনশাআল্লাহ চলে আসবো। তোকে কষ্ট দিচ্ছি রে..
– আরে না
– আমার কলিগরা আবার হোটেলের খাবার খায় না, গ্যাস হয়। আর কাল এমনিতেই শুক্রবার। শনিবারটা থেকে রোববার অটোয়া ফিরিস; আটকাবো না। আরো ঘন্টাখানেক রেস্ট নে। কালকে কোনো প্ল্যান রাখিস না। আমরা নৌকা ভ্রমণে বের হবো বিকেলে। শুধু পাগলের মতো খাটাখাটনি করলেই তো হবে না, রিল্যাক্সেরও দরকার আছে।

আমি বিকাল পাঁচটা থেকে রান্না-বান্না শুরু করে দিলাম। তার এপ্লায়েন্সগুলা দেখার মতো। ফ্রিজটার দাম ত্রিশ হাজার তো হবেই। কমপক্ষে ৮০ সিএফটি। ভেতরে অসংখ্য ড্রয়ার আর কম্পার্টমেন্ট। সুইচ টিপলে আলগোসে বেরিয়ে আসে। পুরাই সায়েন্স ফিকশন। মাইক্রোওয়েভের যা সাইজ, আস্ত খাসি আটবে! মাছ মাংস ডিফ্রস্ট করারও আলাদা এপ্লায়েন্স। ইলিশ মাছের যে সাইজ ভাই রে ভাই.. প্রতিটা কমপক্ষে দুই কেজি। তারমানে একেকটা ইলিশের দাম একশো ডলার তো হবেই। চার প্যাকেট ইলিশ তার স্টকে!

আমি ঘন্টা তিনেকের প্রচেষ্টায় রান্না মোটামুটি গুছিয়ে আনলাম। তারা চলে আসলো।
রিপন, তোকে গরু রাঁধতে বলছিলাম, কই?
– ক্যা? ওই যে!
– হার্ড চিকেন আর গরুর মধ্যে পার্থক্য পাস না বুকা..। এই চিকেন দাওয়াতে দেয়া যায়? তিন মুরুব্বির তো দাঁতই নাই। আর ঐগুলা বেগুন চাক ভাজি না তেলের খনি? এই ভাত দিয়ে সুশি বানালে ভালো করতি; পুরা জাউ! ডেজার্ট?
– বলিসনি তো?
– সব কিছু বলা লাগে?

কিছু মানুষকে আকাশের চাঁদ এনে দিলেও বলবে মঙ্গোল গ্রহ কই? তাদের প্ল্যানিং চলল অনেক রাত পর্যন্ত। হঠাৎ রাত দু’টার সময় আমাকে ঘুমের মধ্যে ঝাঁকালো- এই রিপন, এই রিপন! ঘুমায়ে পড়ছিস?
– না
– সুখবর আছে, মিটিং জমছে! একটা কাজ পারবি?
– বল
– টিম হর্টনস এর ড্রাইভ থ্রু থেকে কফি আনতে পারবি?
– আনতেছি..
– আমিই যেতাম। কিন্তু ক্রুশাল মোমেন্টে বাইরে যাই ক্যামনে?
– অসুবিধা নাই, আমি যাচ্ছি
– আর কোনো পেট্রোল পাম্প পেলে এক কার্টন সিগারেট আনিস তো?
– শিওর
– ক্রেডিট কার্ডটা ধর, তুইও কিছু কিনে খাস। যা খুশি।

টিম হর্টন্সে গিয়ে কফি আর হালকা স্ন্যাক্স নিয়ে আসলাম। সিগারেট আর দুই ফিরিঙ্গির জন্য এলসিবিও থেকে দুই বোতল ভদকার বোতলও আনতে হলো। সাথে ঠান্ডা বিয়ার।

আমরা দুপর পর্যন্ত ঘুমিয়ে বিকালে লেকের ঘাটে আসি। সে বলল, কখনো নৌকা ফুলাইছিস?
– না
– শেখা উচিৎ। এই যে ধর পুশ পাম্প। ফুলাইতে থাক, আমি জরুরি ফোন করে আসি।
আমি পুশ পাম্প দিয়ে নৌকা ফুলিয়ে রেডি করি। সাইকেলের পাম্পের মতোই, তবে অনেক মোটা। দুই চাপে বেলুন ফুলানো যাবে। ৩২ ডিগ্রি গরমে ঘেমে গোসল। বিশাল নৌকা ফুলানো যে কতো কোঠিন, সেটা তার ধারনাও নাই। সে নিজে কিচ্ছু করছে না, শুধু শেখানোর নাম করে হুকুম করে যাচ্ছে। এতোই চালাক! আর বলে আমি নাকি অলস। মানুষ এতো স্বার্থপর কীভাবে হয়? সে কানে মোবাইল ঠেকিয়ে, নবাবী স্টাইলে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে, নাকে তেল দিয়ে ঘুরছে। এরপরে যদি বলে রিপন তুই বইঠা চালা, তখন আমি রাগের মাথায় কি যে করবো!

আমরা লাইফ জ্যাকেট পরে নৌকায় উঠতে থাকি। সে উঠেই আমার পাশে ইংগিত করে বলল, তোর ব্যাগে কী?
– খাবার
– নৌকা চালাইতেও তোর খাওয়া লাগে? আচ্ছা পাবলিক!
আমি খাবার আনলেই সমস্যা। অথচ দেখেন, সে ঠিকই বিড়ি, চুইংগাম পকেটে নিয়ে আসছে। খাবারের প্যাকেটটা ভালোমতো বড় জিপলগ ব্যাগে এয়ারটাইট করে নিয়ে এসেছি, যাতে পানিতে না ভিজে।
তীরে ধাক্কা দিয়ে নৌকা ঠেলে দেই। নৌকা সুরসুর করে লেক অন্টারিওর বিপুল জলরাশীর মধ্যে ভেসে যেতে থাকে। বাতাস দক্ষিণমুখী। অনেক দূর যাওয়ার পর চিশতী বলল, হা করে কী দেখিস? বৈঠা চালা?
– আনা হয়নি
– মানে?
– বৈঠা গাড়িতে, নৌকায় তুলতে মনে নাই
– লা ইলাহা ইল্লা আন্তা..
চিশতী আচ্ছা মতো গালিগালাজ করতে লাগলো। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, কিছুক্ষণ দেখ, কেউ উদ্ধার না করলে নাইন-ওয়ান-ওয়ানে কল দিতে হবে।
ভাগ্য ভালো খাওয়ারটা নিছিলাম। আমরা কখন উদ্ধার পাবো কে জানে। ভাসতে ভাসতে বহুদূর চলে যাই। আশা করে আছি কোনো নৌকা কিংবা স্পিডবোট দেখলে অনুরোধ করবো আমাদের বেঁধে যেন তীরে নিয়ে যায়।

হঠাৎ দূরে একটা স্পীডবোট দেখতে পেয়ে আমরা হাত নাড়াতে থাকি। ওটা তীব্র গতিতে আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে গেলো চোখের পলকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উত্তাল ঢেউ আমাদের নৌকাকে ভয়ংকরভাবে দোলাতে থাকলো। আমরা তাল সামলাতে পারলাম না, নৌকা গেলো উল্টিয়ে। এরকম ঢেউ নৌকার জন্য যে কতটা মারাত্মক, সেটা সত্যিকার পরিস্থিতিতে না পড়লে অনুধাবন করা সম্ভবই না। নাকানি-চুবানি খেয়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবার উপক্রম। আবার, ঠিক যে সময়ে নিঃশ্বাস নিতে যাচ্ছি, তক্ষুনি ঢেউ এসে চুবিয়ে দিচ্ছে। আর যখন শ্বাস ছাড়ছি, তখন কাছে ঢেউ নাই। সৃষ্টিকর্তা এভাবে আমাদের নিয়ে মশকরা করছেন? এভাবে চললে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।

আরো আশ্চর্যের ব্যাপার, আমরা যতই নৌকার দিকে সাঁতরাই, নৌকা ততই দূরে সরে যায়। শেষে চিশতী হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, বাদ দে রিপন। ঐটা আসলে মরীচিকা; মরুভুমির মতো এদেশের পানিতেও মরীচিকা আছে। রিপন রে..
– বল দোস্ত
– তোর ওপর অনেক অন্যায় করছি। মাফ করে দিস
– আরে না, কিসের অন্যায়
– দেখ আমরা কতো ক্ষুদ্র? জীবনের কোনো গ্যারান্টি আছে? এখন আমরা মরে গেলে পৃথিবীর কিছ্ছু হবে না।
সত্যি, প্রকৃতির মহা শক্তির কাছে আমরা কিছুই না।

মিনিট পনেরো পরে পানি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসলো। নাইন-ওয়ান-ওয়ান এ কল দেব, সে উপায় নাই। মোবাইলে পানি ঢুকে বন্ধ হয়ে আছে। বললাম, দোস্ত হাঙ্গর নাই তো?
– অন্টারিও লেকে হাঙ্গর আসবে কোত্থেকে? কোথাও শুনছিস?
– না, মানে.. কিউবেক থেকে সেন্ট লরেন্স নদী দিয়ে যদি আসে?
– মরার আগেও তোর ফাউল কথা বলা থামলো না!
– দোস্তরে, রাত নামলে?

সন্ধ্যা হবার বাকি নেই। গায়ের শক্তি আমাদের নিঃশেষ। ভাগ্যে তাহলে এরকম মরন ছিল? সন্ধ্যার ঠিক আগে আগে ক্লান্ত স্বরে বললাম, দোস্ত আয় বিরিয়ানি খাই। মরার আগে আরও কিছুক্ষণ তাজা থাকা যাবে
– খারাপ বলিসনি। রাতটা কোনোরকমে কাটলে সকালে উদ্ধার পাইতেও পারি। আরেক বক্সে কী?
– স্প্রিং রোল
– স্টকে রাখ।
বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে দুজন ভাগ করে খেতে থাকি। ভাগ্য ভালো সামুদ্র না, তখন খাবার পানি কোথায় পেতাম?
ভেবে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো!

সন্ধ্যা নেমে গেছে।
আরও প্রায় ঘন্টাখানেক ভাসার পর হঠাৎ দেখি পশ্চিম আকাশে একটা ছোট্ট আলোর বিন্দু। কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের দিকে এগিয়ে আসলো। তারপর হেলিকপ্টারের কান ফাটানো বিকট শব্দে আমরা বধির হয়ে গেলাম। তীব্র বাতাসে নিঃশ্বাস নেবার উপায় নেই। আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠি। প্রায় ত্রিশ ফুট মাথার উপরে ওটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সাথে সাথে দড়ি নামিয়ে দিলো। আমরা দুজনেই একসাথে হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করি। চিশতী প্রথমে দড়ি ধরে ফেললেও ঢেউ এর কারনে ছুটে গেল। তার হাত থেকে ছুটে এসে এবার আমার হাতের মধ্যে এসে পড়লো। শক্ত করে ধরে ফেললাম। এবার উদ্ধার কর্মী দড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে আমাকে বেল্ট দিয়ে ভালোমতো বেধে ঝুলাতে ঝুলাতে উড়িয়ে নিয়ে চলল তীরের দিকে। আমি চিশতীর দিকে চিল্লিয়ে বললাম, আমরা আসতেছি দোস্ত!

উদ্ধারকারী আমার কানে কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেশ করলো, হোয়াইট’স ইন ইয়োর হ্যান্ড বাডি?
– ফুড
– হোয়াট!
– ফুড ভাই, ফুড..

চিশতী মাথা উঁচু করে করুন চোখে আমাদের চলে যাওয়া দেখতে লাগলো। তীরে দুটা এম্বুল্যান্স, কিছু পুলিশের গাড়ি আর ফায়ার ফাইটারের বিশাল গাড়ি দাঁড়ানো, স্ট্রেচার রেডি। লাল আলোর তীব্র ঝলকানি দিয়ে জ্বলছে, নিভছে। বেশ কিছু মানুষের জটলা।
আমি চোখ বন্ধ করে ঝুলতে থাকি, দড়ি শক্ত করে ধরে!

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles