ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে যথাযথ খাদ্য ব্যবস্থাপনা

- Advertisement -
ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পরিমিত পরিমাণে সুষম খাদ্য এবং তা সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে হবে

 

আলুর খোসার স্বাস্থ্য উপকারিতা জানলে অবাক হবেন!
হঠাৎ করে ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে কিংবা হঠাৎ করে ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে আমরা অনেকেই ভেঙ্গে পড়ি, হতাশ হয়ে যাই। ডায়াবেটিস শনাক্ত হলেই আমরা ভেবে থাকি যে, আমার জীবনটা বুঝি স্তব্ধ হয়ে গেল, কিংবা জীবনটাই থেমে গেল! ডায়াবেটিস হলে অনেকের ধারণা, সমস্ত খাবার থেকে সে বঞ্চিত হয়ে গেল। অনেকেরই ধারণা, ডায়াবেটিস হয়েছে বলেই তার প্রিয় প্রিয় খাবারগুলো আর সে কখনো খেতে পারবে না!

- Advertisement -

হঠাৎ করে ডায়াবেটিস শনাক্ত হলে অনেকেরই খুব বেশি মন খারাপ হয়ে যায়, হতাশ হয়ে পড়ে এবং এতে করে তার ডায়াবেটিসের অবস্থা দিনকে দিন আরো খারাপ হতে থাকে। কখনোই যা কারো জন্যই কাম্য নয়। তাই ডায়াবেটিস শনাক্তের সাথে সাথে দেরি না করে একজন ডায়াবেটোলজিস্ট-এর পরামর্শ অনুয়ায়ী প্রয়োজন মাফিক মেডিসিন এবং অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ মতো তার খাদ্য তালিকাটি সাজিয়ে নিতে হবে।

ডায়াবেটিস শনাক্তের সাথে সাথে তাকে শৃঙ্খলিত অর্থাৎ নিয়মানুবর্তিতার জীবন যাপন করতে হবে। শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। একজন ডায়াবেটিক রোগীর ক্ষেত্রে তার খাদ্যতালিকা এমনভাবে সাজাতে হবে যেন, তাঁর সারাদিনের খাবার তিন বেলা নয়, পাঁচ বারে ভাগ করে খেতে হবে। এতে করে অল্প খাবার দ্রুত মেটাবলিজম হয়ে যাবে। এর ফলে রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম হবে।

- Advertisement -

একজন ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পরিমিত পরিমাণে সুষম খাদ্য এবং তা সঠিক সময়ে গ্রহণ করতে হবে অর্থাৎ সকালের নাস্তা ঠিক সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে করতে হবে এবং এরপর সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে হাল্কা কিছু নাস্তা কিংবা ভিটামিন সি যুক্ত ফল খেতে হবে। দুপুরের খাবার সময় মত খেতে হবে, বিকালে হালকা একটু নাস্তা নিতে হবে এবং রাতের খাবারটা যতটা সম্ভব ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে শেষ করে নিতে হবে। সঙ্গে রাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে।

- Advertisement -

একইসঙ্গে একজন ডায়াবেটিক রোগীর ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অবশ্যই প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটতে হবে।

ডায়াবেটিস রোগীর দৈনিক খাদ্য তালিকাঃ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই চলছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের টাইপ টু ডায়াবেটিসের সংখ্যা ইদানিং বহু সংখ্যক বেড়ে গেছে। মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায় এরকম প্রধান পাঁচটি কারণের মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে।

আসলে জীবনযাপন এবং খাদ্যাভাসে নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাবার নিয়ে অনেকেরই নানা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকেই ডায়াবেটিস হলে ভাত খাওয়া ছেড়ে দেন একরকম কিংবা মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার কিংবা অন্যান্য প্রিয় খাবারগুলো বন্ধ করে দেন। ডায়াবেটিস হলে সব খাবার গণহারে বন্ধ না করে কোন খাবার ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং কোন খাবারগুলো ব্লাড সুগার বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে, এসব বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখে দৈনিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা সাজাতে হবে।

এক্ষেত্রে সরল শর্করা এবং জটিল শর্করা ব্যাপার আছে। যেমন- চিনিজাতীয় খাবার না খেয়েও যদি সাদা আটা, ময়দা, চালের ভাত খাওয়া হয়, সেক্ষেত্রেও ডায়াবেটিস অবশ্যই বেড়ে যাবে। কিন্তু এর পরিবর্তে যদি রান্নাটা লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, বার্লি, দই, টক দই খাওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং শরীর সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকবে।

অনেকেই ধারণা করেন, বেশি প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে বুঝি ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। কথাটা আদতে ঠিক নয়। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার বিশেষ করে, প্রাণীজ প্রোটিন ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এর ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ শর্করা নিয়ন্ত্রণে হরমোনের কার্যক্ষমতা হ্রাস করে।

মূল কথা হলো শর্করা, আমিষ ও চর্বি জাতীয় খাবার যা-ই খাই না কেন, তা যেন সুষম বণ্টন হয়। অর্থাৎ একজন টাইপ টু ডায়াবেটিস রোগীর খাদ্য ব্যবস্থাপনা সুষম স্বাস্থ্যকর ও পরিমিত পরিমাণের হতে হবে।

ডায়াবেটিস হলে যেসব খাবার পরিহার করাই ভালঃ

অতিরিক্ত চিনি এবং লবণ,

খাবার রান্না করা খাবার, যেমন- চিকেন ফ্রাই জাতীয় খাবার,

প্যাকেটজাত ফাস্টফুড বিশেষ করে, যাতে চিনি থাকে, বেকিং করা খাবার, মিষ্টি, চিপস, ডেজার্ট

সাদা আটার রুটি, ডিম, পাউরুটি, চিনিযুক্ত সিরিয়াল, প্রক্রিয়াজাত নুডুলস, পাস্তা

প্রক্রিয়াজাত মাছ বা মাংস, অর্থাৎ ক্যান ফুড, ক্যান জুস ইত্যাদি পরিহার করা

কোমলপানীয় যেমন- কোক, ফান্টা, সেভেন আপ বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংকসগুলো ডায়াবেটিস রোগীর জন্য একেবারেই গ্রহণ করা উচিৎ নয়।

ডায়াবেটিস রোগীদের যেসব খাবার খাওয়া ভালঃ
উচ্চ খাদ্য আঁশযুক্ত লাল আটার রুটি, লাল চালের ভাত, ব্রাউন ব্রেড, ওটস, ওটমিল, চিড়া ইত্যাদি, তাজা শাকসবজি ও ফলমূল, তাজা, পরিষ্কার, টাটকা শাকসবজি খাওয়া ভালো, কাঁচা ফল খাওয়া বেশি ভালো। এতে করে খাদ্যআঁশ রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে এবং তাজা শাকসবজি ও ফলমূলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় তা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

দেশীয় মাছ ও মুরগি, উপকারী চর্বি যেমন- বাদাম, অলিভ অয়েল, মাছের তেল ইত্যাদি উচ্চমানের প্রোটিন এবং ভালো মানের প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে, যেমন- ডিম, অল্প চর্বিযুক্ত দুধ, টক দই, ছানা কিংবা পনির পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করতে হবে।

ডায়াবেটিক রোগীর সকালের নাস্তাঃ
ডায়াবেটিস রোগীর সকালের নাস্তা যেমন সুষম স্বাস্থ্যকর হতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে করতে হবে। অর্থাৎ সকালের নাস্তা ঠিক সকালেই করতে হবে। একজন ডায়াবেটিক রোগীর সকালের নাস্তা ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে করে নেয়াই শ্রেয়। কারণ একজন ডায়াবেটিস রোগীর খাবারটা ৩ বেলায় না খেয়ে ৫ বেলায় ভাগ করে খেতে হবে। এতে করে রক্তের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকবে খুব সহজেই।

টক দই ও চিড়া
ফ্যাট ফ্রি ও ক্যালসিয়াম যুক্ত টক দই দিয়ে খাদ্যআঁশ যুক্ত চিড়া দিয়ে সকালের নাস্তা করলে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর সঙ্গে একটি ডিম সিদ্ধ এবং এক কাপ গ্রিন টি-ই যথেষ্ট।

লাল আটার রুটি ও পাঁচমিশালি সব্জি
লাল আটার রুটি ২টি এবং এক কাপ মিক্সড সবজি, একটি ডিম সিদ্ধ এবং এক কাপ রং চা (চিনি ছাড়া)।

মিক্সড ব্রেকফাস্ট
ফ্যাট ফ্রি টক দই, মিক্সড ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম, ওয়ালমাট, কনফ্লেক্স কিংবা ওটস মিক্স করে খেয়ে নিতে পারেন। এটা পুষ্টিকর ও উপকারী। এর সাথে অবশ্য একটি ডিম সিদ্ধ এবং এক কাপ গ্রিন টি নেয়া যাবে।

সুগার ফ্রী ব্রাউন ব্রেড এবং ডিম ওমলেট
টমেটো, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ দিয়ে একটি ডিম অলিভ অয়েলে ভেজে নিন, সাথে একটি ডিম এবং এর সাথে ২ পিস ব্রাউন ব্রেড এবং ১টি শশা নেয়া যাবে।

মধ্য সকালের নাস্তা
সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ভিটামিন সি যুক্ত যে কোন একটি ফল যেমন- সবুজ আপেল, সবুজ পেয়ারা, আনারস, জাম্বুরা, নাশপাতি, মাল্টা, কমলা ইত্যাদি নিতে হবে এবং এর সাথে ২০ গ্রাম বাদাম খেতে হবে।

দুপুরের খাবার
দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিতে হবে। দুপুরের সময় পরিমিত পরিমাণে লাল চালের ভাত, এর সাথে সবুজ রঙের শাক এবং মিক্সড সবজি, ২ পিস দেশীয় মাছ বা মুরগি, এর সাথে মিক্সড ডাল এক কাপ নেয়া যাবে। অতিরিক্ত ভাত না নিয়ে এক কাপ মিক্সড ডাল, লেবু আর শশা দিয়ে স্যুপের মত খাওয়াই ভাল।

সালাদ
বিভিন্ন ধরনের ও বিভিন্ন কালারের সবজি যেমন- শসা, টমেটো, পরিমিত পরিমাণে গাজর, লেটুস পাতা সবকিছু মিলিয়ে একটি সালাদ অবশ্যই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য।

টক দই বা রায়তা
ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ ও ফ্যাট ফ্রি ঘরে পাতা টক দই হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং ব্লাড সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

ডায়াবেটিস রোগীর বিকালের নাস্তা
বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যেই হাল্কা ধরনের বিকালের নাস্তা নিতে হবে। কারণ ডায়াবেটিস রোগীদের কিছুক্ষণ পরপরই হালকা কিছু নাস্তা করা উচিৎ। যেমন- চিনি ছাড়া বিস্কুট, মুড়ি, খই, সবজি স্যুপ ইত্যাদি বিকালের নাস্তায় রাখা যেতে পারে।

চা ও বিস্কুট
এক কাপ গ্রিন টি অথবা মাসালা রং চা (চিনি ছাড়া), যে কোনো বিস্কুট (চিনি ছাড়া), মুড়ি বা সুগার ফ্রি টোস্ট বিস্কুট খাওয়া যেতে পারে।

সবজি স্যুপ
বিভিন্ন ধরনের সবজি দিয়ে এবং এক পিস চিকেন দিয়ে এক বাটি সবজি স্যুপ খাওয়া যেতে পারে। এতে করে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং একজন ডায়াবেটিক রোগী সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবন-যাপন করতে সক্ষম হবেন।

চিনিমুক্ত হালুয়া
গাজর কিংবা যে কোন সবজির হালুয়া খেতে পারেন। এছাড়াও বুটের হালুয়া হবে স্বাস্থ্যকর, তবে চিনি ছাড়া হতে হবে।

ফল ও বাদাম
এছাড়া বিকালের নাস্তায় লবন ছাড়া ভিটামিন সি যুক্ত যে কোনো একটি ফল এবং ২০ গ্রাম বাদাম রাখা যাবে অনায়াসে।

রাতের খাবার
রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যেই রাতের খাবার খাওয়া উচিৎ।

রুটি ও রুটি জাতীয় খাবার
রাতের বেলায় ভাতের পরিবর্তে লাল আটার রুটি কিংবা যে কোন আটার রুটি খাওয়াই ভাল। কারণ রাতের বেলায় ভাত নিলে ব্লাড সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই চাল, গম কিংবা আটার তৈরি পাতলা দুই থেকে তিনটি রুটিই রাতের জন্য যথেষ্ট।

সবজি
রাতে রুটির সঙ্গে হালকা সবজি খাওয়া যেতে পারে। সঙ্গে মাছ বা দেশী মুরগী খাওয়া উচিত। এক পিস নদীর মাছই যথেষ্ট।

রাত ১১টার দিকে বা ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে এক কাপ নন ফ্যাট দুধ খাওয়া উচিৎ। এতে করে ডায়াবেটিস রোগীরা ক্যালসিয়ামের ঘাটতিজনিত রোগ থেকে মুক্ত থাকবেন।

নিয়মিত সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে এবং প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটতে হবে এবং এর সাথে কিছু হালকা ব্যয়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।

সুতারং, ডায়াবেটিস হলে বা ব্লাড সুগার বেড়ে গেলে যথাযথ যত্নের মাধ্যমে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে হবে এবং একজন ডায়াবেটিক রোগীকে অবশ্যই হাসিখুশি ও প্রাণোচ্ছল থাকতে হবে। তাহলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার যাত্রাটা শুধুমাত্র একজন ডায়াবেটিক রোগীর একার জন্যই নয় বরং এই যাত্রা সফল করতে হলে একটি পরিবারের সম্মিলিত প্রয়াস থাকতে হবে।

লেখক- ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিষ্ট এন্ড ডায়েটিশিয়ান, উত্তরা ক্রিসেন্ট হসপিটাল, উত্তরা, ঢাকা।

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles