7.1 C
Toronto
শুক্রবার, মার্চ ১, ২০২৪

নাকে ভেসে আসলো ইউনিক ফ্লেভার

নাকে ভেসে আসলো ইউনিক ফ্লেভার

আজ আর বেশি দূরের বাজারে যাবো না। বাসার পাশে সাদ্দাম বাজারে যা পাওয়া যায়, তা-ই নিয়ে বাসায় ফিরবো।

- Advertisement -

বাজার শেষে পৌনে এগারোটার দিকে মাছ আর কাঁচা বাজারের ব্যাগ নিয়ে পাশের ছাপড়া হোটেলে ঢুকলাম। কুষ্টিয়া আসার পর থেকে, অর্থাৎ সেই সাতাশি সাল থেকে হোটেলটা দেখছি। কলকাকলি স্কুল বা জেলা স্কুলে যাবার পথে হোটেলটা; জামে মসজিদটার সামনে। অস্থির হয়ে উঠলাম গরম গোলগাল নাদুসনুদুস সিঙ্গারা ভাজতে দেখে। অপেক্ষায় থাকলাম বিরাট কড়াই থেকে তেল নিংড়ে কখন উঠানো হবে প্রথম ব্যাচের আগুন গরম সিঙ্গারা! খিদে মোচড় দিয়ে উঠলো।
.
পনেরো মিনিটের অপেক্ষার পালা শেষ; দিয়ে গেলো দু’টা।

এতো গরম; যে মুখে দেওয়া যায় না। ভাংতেই ভেতর থেকে উঁকি দিলো কিছু কাঁচা বাদাম, আধা সেদ্ধ পেঁয়াজ, পাঁচফোঁড়ন, ধোনে পাতা আর আলু। চামড়া থেকে ছুটছে আটা, কালোজিরা আর সয়াবিন তেলের একত্রে মনোমুগ্ধকর মুচমুচে সুবাস। যেটা একমাত্র সিঙ্গারায় মেলে। আর টিনের হাফপ্লেটের পাশে দিয়েছে কিছু কাঁচা পেঁয়াজ, সস্তা লালচে আমড়ার টক। শরীর জুড়ে বিটলবণ মেশানো লাল মরিচ গুঁড়া। আগে অবশ্য শসা দিতো, এখন দামের কারণে কুলিয়ে উঠতে পারে না।
.
অনেকে অপেক্ষা করছিল আমার মতোই।

তেল থেকে উঠা মাত্র ঠোঙা ভরে নিয়ে খুশি মনে হাঁটা ধরছে। সমুচা ভাজতে যদিও দেরি আছে। পেঁয়াজের পাহাড়ে গুঁড়োতে কিমার মিশ্রণ। সমুচার বিশেষত্বই এটা; ভেতরটা কাঁচা কাঁচা থাকবে আর বাইরেরটা দারুন মুচমুচে। মনে পড়ে গেল বিয়ের আগে আমাদের এনগেজমেন্টের পর অফিস শেষ করে ছুটতাম ঢাকা টিটি কলেজের দিকে। অপোজিট থেকে টেকআউট সমুচা হাতে নিয়ে হবু গিন্নীর সাথে দেখা করতে যেতাম। এর চাইতে মজার সমুচা দুনিয়ায় নাই।
.
যাই হোক, কেউ আবার সরাসরি নিজ হাত দিয়ে সিঙ্গারা বেছে নিয়ে খেতে শুরু করছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। কোনো ভোজন রসিক আবার এক ঠোঙা পুরি কিনে পলিথিনে মাংসের ঝোল চেয়ে নিলো।
.
মুখ, দাঁতের মাড়ি আর জিব্বা পুড়িয়ে ওগুলো শেষ করে চ্যাপ্টা কাপে মালাই চায়ে চুমুক দিতে দিতে মানুষের কীর্তিকলাপ, নিপুণ হাতে সিঙ্গারা, পুরি, জিলাপি বানানো দৃশ্য দেখার মধ্যে একটা নেশা আছে। পাশের টেবিলে একজন সকালের শেষ ক’টা পরোটা আর ডালভাজি নিয়ে বসেছে। মনে হয় হোটেলেরই কর্মচারী। আমার পায়ের কাছে রাখা বাজারের ব্যাগটাতে উঁকি দিচ্ছে পাটশাকের পাতা। ভেতরে আছে মসুরের ডাল, পেঁয়াজ-মরিচ, আদা-রসুন, টমেটো, পাকা মিষ্টিকুমড়ার ফালি, কাঁচা ডুমুর, তেলাপিয়া মাছ আর হাঁসের ডিম।
.
চোখের সামনে ভেসে উঠলো পাট শাক ভাজি আর নাকে ভেসে আসলো ইউনিক ফ্লেভার। পাতাগুলো রান্নার পরও আস্ত থাকে। বাংলাদেশের মতো এতো ভ্যারাইটির শাক মনে হয় পৃথিবীর আর কোথাও নাই। পাট, ঢেঁকি, কলমি, লাল শাক, ডাঁটা, পুঁই, থানকুনি, বাইতো, গন্ধ ভাদালি, মটরশুঁটি, মুলা, সর্ষে, কচু, সজনে, আলু, লাউ-কুমড়ার শাকের বাহার! কোনোটার চাইতে কোনোটা কম নয়।
.
আরও দিব্যি দেখতে পাচ্ছি হাঁসের ডিমগুলো সেদ্ধ করে গরম তেলে ভালমতো ভেজে লালচে করবার দৃশ্য। কি সেই মিষ্টি পটপট শব্দ! ওগুলো যখন এক গাদা আদা-রসুন বাটার মধ্যে দোপেঁয়াজা করা হবে, তৈরি হবে দুনিয়ার স্রেষ্ঠ খাবার। কচি ডুমুর ভাজির সাথে কচি মিষ্টি কুমড়ার ফালি দিয়ে ডিম ভুনা। আগুনগরম মশুর ডাল দিয়ে। ওটা হবে অবশ্য রাতের আইটেম..
উফফ! আর তর সইছে না।
.
আর দুপুরে থাকবে টমেটো, আলু ফালি, ধনেপাতা দিয়ে তেলাপিয়া মাছের ঝোল। কি যে সুবাস! মনে হয় আস্ত কড়াই ধরেই আগে কয়েকটা চুমুক মেরে নিয়ে তবে খেতে বসি..। ব্যাগের মধ্যে তেলাপিয়াগুলোর নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে। ছোটকাল থেকেই তেলাপিয়া মাছটার প্রতি আমার প্রচন্ড দুর্বলতা। নানা মুনির নানা কটূক্তি আমাকে একটুও টলাতে পারেনি। বরং ভালবাসা আরো অটুট হয়েছে।
.
আরও একটা সিঙ্গারা নিলেও হয়..।
বিকালে অবশ্য আরেকবার শহরটা চক্কর মারতে বের হবো।
এটা আমার প্রতিদিনের অভ্যাস। নদীর ধারে কিছুক্ষন হাঁটাহাঁটি করে সিঙ্গার মোড় দিয়ে সরকারি কলেজ এলাকার দিয়ে এগুতে থাকবো। সরকারি কলেজ পেরিয়ে হাসপাতাল মোড়ে একটা হোটেলে ঢুকে সবজি-কলিজা রোল খাবো। এরও কোনো তুলনা নাই। প্রায় আট ইঞ্চি, বিরাট সাইজের। বিস্কুটের গুঁড়া মাখিয়ে ভাজা। ভেতরে থাকে বেগুন, আলু, পটল, বরবটি আর হাতে গোনা ক’এক পিস কলিজা। কামড় বসালে রোলটা খানিকটা ফেটে গিয়ে বরবটির সুমিষ্ট ছোট বিচিগুলো বেরিয়ে পড়বে। আহা!
প্রতিদিন অবশ্য পাওয়া যায় না।
.
হাত ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখি অলরেডি সাড়ে এগারোটা বাজে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট বসে আছি! ওদিকে রান্নার যে লেট হয়ে যাচ্ছে?
পেছনে বেসিনে হাত ধুতে গিয়ে পাশের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles