12.9 C
Toronto
রবিবার, মে ২৬, ২০২৪

কেন আত্মহত্যায় সমাধান খুঁজছেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকরা?

কেন আত্মহত্যায় সমাধান খুঁজছেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকরা?
প্রতীকী ছবি

চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্য, বেতন কম, অত্যধিক কাজের চাপ, সংসারে টানাপোড়েন, চাল আনতে পান্তা ফুরোয়- এমন ঘটনায় আত্মহত্যার খবর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেকটাই স্বাভাবিক ঘটনা। শুধু স্বাভাবিক বললে কম হবে, হরহামেশাই পত্রিকার পাতায় থাকে এমন লোমহর্ষক শিরোনাম।

তবে এসব কারণে উন্নত বিশ্বের অন্যতম দেশ যুক্তরাজ্যের চিকিৎসকদের আত্মহত্যার খবর শুনলে যেন গা শিউরে ওঠে। তেমনই এক উদাহরণ জগদীপ সিধু।

- Advertisement -

আশির দশকে পরিবারের সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যারো শহরে বেড়ে ওঠেন জগদীপ সিধু। ওই এলাকায় সংখ্যালঘু অশেতাঙ্গ এবং দক্ষিণ এশীয় হওয়ার কারণে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয় তার পরিবার। মূলত যুক্তরাজ্য জুড়েই বিরাজমান এ বৈষম্য।

জগদীপের মনে দানা বাঁধে এসব বর্ণবাদ ও বৈষম্য। তিনি পণ করেন, তাকে ও তার পরিবারকে পীড়নকারী প্রতিবেশীদের চেয়ে একদিন নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করবেন তিনি। সেই লক্ষ্যে ক্যারিয়ার গড়া শুরু করেন জগদীপ। মেধার স্বাক্ষর রেখে মেডিকেলে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন পশ্চিম লন্ডনের ইয়ালিং হাসপাতালে।

জগদীপের ভাই আমানদীপ বলেন, প্রায় ২৫ বছর চিকিৎসা পেশায় থেকে বেশ নামডাক হয়েছিল তার। সর্বশেষ ক্যান্টে অবস্থিত একটি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জগদীপের সহকর্মীরা প্রায়ই অতিরিক্ত কমিশনের লোভে রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। তবে এক্ষেত্রে জগদীপ ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি সব রোগীকেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিতেন। এ কাজকে নিজের পবিত্র দায়িত্ব মনে করতেন তিনি।

তবে জগদীপের সততায় বাঁধা হয়ে দাঁড়ান তারই সহকর্মীরা। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন সহকর্মীরা।

মামলার পর হাসপাতাল তাকে ছয় মাসের ছুটিতে পাঠায়। এ সময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন জগদীপ। ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন সৎ এই চিকিৎসক। ভাই আমানদীপ তাকে দেখে অবাক হন। তিনি দেখেন, জগদীপ কাঁদছেন। এর আগে তার বাবার মৃত্যুর সময় কেঁদেছিলেন জগদীপ।

এর কয়েক দিন পর নভেম্বরের ২৭ তারিখ দুপুর আড়াইটায় জগদীপের কাছ থেকে একটি মেইল পায় আমানদীপ। এতে জায়গা সম্পদের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পর্কিত যাবতীয় নির্দেশনা দেন জগদীপ। শেষে লেখেন, আমাকে আপনি বিচি হেডে গাড়িসহ খুঁজে পাবেন। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র তীরবর্তী একটি উঁচু জায়গা বিচি হেড, আত্মহত্যার জন্য বিখ্যাত।

সহকর্মীদের কাছ থেকে বৈষম্যের শিকার হয়ে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে নিজের জীবন কেড়ে নেন এই চিকিৎসক।

আলজাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে, শুধু জগদীপই নন। যুক্তরাজ্যে চিকিৎসকদের মধ্যে এমন আত্মহত্যার ঘটনা আজকাল আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারী এবং অল্প বয়সি চিকিৎসকরাই এই পথ বেছে নিচ্ছেন।

অভাবনীয় পরিসংখ্যান
সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধু ২০২০ সালেই চিকিৎসাসেবায় জড়িত (চিকিৎসক, নার্স ও থেরাপিস্ট) অন্তত ৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ হিসাবে প্রতি সপ্তাহে গড়ে একজনের বেশি আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া ২০২২ সালে চিকিৎসাক্ষেত্রে জড়িতদের মধ্যে ৩৬০টি আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে।

পরিসংখ্যান আরও বলছে, গড়পড়তায় সাধারণ মানুষের তুলনায় যুক্তরাজ্যের নারী চিকিৎসকদের মধ্যে আত্মহত্যার হার চার গুণ বেশি।

আত্মহত্যার কারণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের মধ্যে আত্মহত্যার এমন উচ্চহারের জন্য প্রথমেই দায়ী অত্যধিক কাজের চাপ এবং এ থেকে সৃষ্ট বিষণ্নতা। কঠোর নিয়মশৃঙ্খলের এই পেশায় রয়েছে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা, দলাদলি, গুন্ডামির মতো বিষয়ও। এ ছাড়া হয়রানি, ঘুমের অভাবজনিত কারণেও কর্মীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।

গেইল কিনম্যান নামের এক চিকিৎসাবিজ্ঞানী বলেন, কয়েকজন মাত্র চিকিৎসক, চিকিৎসা উপকরণ ও জনশক্তিও কম। কিন্তু অসীম কাজের চাপ। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাঁধে রোগীদের জন্য আত্মত্যাগ ও আপন জীবন উজাড় করার ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ভয়াবহ বুলিং
যুক্তরাজ্যে জন্ম না নেওয়া শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হেনস্তা, বর্ণবাদ ও কুসংস্কারের শিকার হতে হয় দেশটিতে। এক ব্রিটিশ পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভয়াবহ বুলিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। তিনি জানান, একবার লন্ডনের একটি হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগে কাজ করার সময় এক সিনিয়রের একটি প্রশ্নের উত্তর ভুল দেন তিনি। এরপর ওই সিনিয়ন চিকিৎসক তাকে অন্যান্য জুনিয়র চিকিৎসকদের সামনে বুলিং করেন। তিনি বলেন, তুমি নিশ্চয়ই কোন পশ্চাৎপদ বালুপূজারিদের দেশ থেকে এসেছো? তখন জুনিয়র সবাই চুপসে যায়। এভাবে জুনিয়র ও অশেতাঙ্গ চিকিৎসকদের ওপর চলে বুলিং।

চিকিৎসক বনে যান রোগী
প্রচণ্ড কাজের চাপে চিকিৎসকরা রোগী বনে যাওয়ার ঘটনাও কম নয়। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে তুলনামূলক জুনিয়র চিকিৎসরাই এ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার শিকার হন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত কাজ করেও কাজ শেষ করতে পারেন না, এমন নজিরও আছে।

প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী হয়ে হাসপাতালে ভর্তির তিন-চার বছর পর মানসিক রোগী হয়ে চিকিৎসার জন্য একই হাসপাতালের বিছানায় পড়ে থাকার দৃষ্টান্তও রয়েছে।

এক চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত সময় কাজ করেও সিনিয়র ডাক্তারের দেওয়া কাজ শেষ করতে না পারায় শুনতে হয় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles