-5.5 C
Toronto
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৪

কারও মৃত্যু নিয়ে মশকরা ভালো না

কারও মৃত্যু নিয়ে মশকরা ভালো না
<br >বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

আমরা কোথায় আছি, মানুষের মৃত্যু নিয়ে মশকরা। বড় কষ্ট হয়। আমি তেমন মোবাইল টিপতে জানি না। ফেসবুক তো চালাতেই পারি না। কিন্তু তবু সহকর্মীরা এটা ওটা দেখিয়ে দেওয়ায় কখনো-সখনো টিপাটিপি করে হঠাৎই এটা ওটা পেয়ে যাই। তেমনি সেদিন ওবায়দুল কাদেরের জানাজার ভিডিও দেখে হতবাক বিস্মিত হয়েছি। জীবিত মানুষের মৃত্যুর খবরে তার আয়ু বাড়ে। আশির দশকে ভারতে নির্বাসিত থাকতে ’৭৭, ’৭৮-এর এ যুগের গান্ধী সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের মৃত্যু সংবাদ পেয়েছিলাম। আকাশবাণীতে যখন খবরটি প্রচারিত হয় তখন আমরা খেতে বসেছিলাম। মা ছিলেন বাম পাশে বসা। কয়েক লোকমা খাওয়ার পর খবরটা শুনেছিলাম। রেডিও ছিল মাঝের ঘরে। আমরা পুবপাশের ঘরে খাচ্ছিলাম। জয়প্রকাশ নারায়ণের মৃত্যু সংবাদে কেমন যেন বুকটা ভারী হয়ে এসেছিল। তাই আর খেতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর যেমন মাংস মুখে দিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলাম। প্লেটের মাংস বঙ্গবন্ধুর মাংস বলে মনে হচ্ছিল। মুখ থেকে খাবার ফেলে দিয়েছিলাম। ঠিক তেমনি লেগেছিল জয়প্রকাশ নারায়ণের মৃত্যু সংবাদে। কারণ জয়প্রকাশ নারায়ণ আমাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। সব রকম সহযোগিতা করেছেন। পাটনায়, না দিল্লিতে, না বোম্বেতে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক তখন আবার খবর আসে, না জয়প্রকাশ নারায়ণ মরেননি। মহান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই নিজে খবরটি দিয়েছিলেন। আগের খবরটি ভ্রান্ত ছিল। তারপর প্রায় পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অসত্য মৃত্যু খবর যেন রটনাকারীদের মুখে ছাই পড়ে। আল্লাহ যেন ওবায়দুল কাদেরকে সুস্বাস্থ্যে দীর্ঘজীবী করেন।

দেখতে দেখতে মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধুর কাছে কীভাবে অস্ত্র জমাদানের ৫০ বছর কেটে গেল বুঝতেও পারলাম না। সময় কত তাড়াতাড়ি যায় ব্যস্ত থাকলে বোঝা যায় না। বোঝা যায় কোনো কাজকর্ম না থাকলে। কখনো-সখনো মনে হয় এই তো সেদিন দেশ স্বাধীন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে কাদেরিয়া বাহিনীর উদ্যোগে পল্টনে জনসভায় ‘রবিবারের পূর্বদেশ’ পত্রিকার এক পাতার ছবি আমার বৈঠকখানায়। ছবিটি সব সময় চোখে পড়ে। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ারুল আলম শহীদ, শেখ জামাল, জাহাজমারা কমান্ডার হাবিব আছে তাতে। বহুদিন পর টাঙ্গাইল শহীদ মিনারে ২৪ জানুয়ারি পিতার কাছে অস্ত্র জমা দেওয়া নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতদিন দেখেছি সভা-সমাবেশে কম লোক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লোকজনে সয়লাব। কিন্তু গত ২৪ জানুয়ারি কেন যেন সব উল্টো হলো। আলোচনা সভায় যত লোক ছিল তার ২৫-৩০ ভাগের এক ভাগ লোক ছিল সংগীত অনুষ্ঠানে। টাঙ্গাইলের মনির, পল্লীগীতি সম্রাট আবদুল আলীমের ছেলে আজগর আলীম, সখিপুর নলুয়ার আবু বকর সিদ্দিকী ও বিখ্যাত গায়ক ফকির শাহাবুদ্দিন মঞ্চ এবং শ্রোতাদের নাচিয়ে গান গেয়েছে। কিন্তু সভার লোক ধরে রাখতে পারেনি। টুংটাং করতে করতে অনেক লোক চলে গিয়েছিল। যে কারণে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মঞ্চের সামনে বসেছিলাম। বড় ভালো লেগেছে, বড় তৃপ্তি পেয়েছি। অস্ত্র জমাদানের সুবর্ণজয়ন্তী পালনের উদ্যোগ যখন নেওয়া হয় তখন হাতে ১০০ টাকাও ছিল না। কিন্তু খুবই সুন্দরভাবে প্রয়োজনীয় টাকা পাওয়া গেছে। কর্মীরা যার কাছে গেছে কেউ ফিরিয়ে দেননি। কেউ হাজার টাকা, কেউ ১০ হাজার, কেউ কেউ অবলীলায় তার চেয়েও বেশি দিয়েছেন। কম দেওয়ার লোকজনও আছে। মজার ব্যাপার কেউ ফিরিয়ে দেননি। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এবং আওয়ামী লীগ থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক শ্রী মৃণাল কান্তি দাস এসেছিলেন। দারুণ সুন্দর বক্তৃতা করেছেন, টাঙ্গাইলের মানুষ খুব খুশি হয়েছে। কাদেরিয়া বাহিনীর বীর যোদ্ধা আমাদের প্রিয় কৃষিমন্ত্রী ডা. আবদুর রাজ্জাক দেশে ছিলেন না। ফিরে ছিলেন ২৩ জানুয়ারি রাতে। তাই শত চেষ্টা করেও তাকে ভালোভাবে দাওয়াত করা যায়নি। তবে কার্ড পাঠিয়ে দাওয়াত করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতারা আসবেন। সব সময় আলমগীর খান মেনু, ফজলুর রহমান খান ফারুক, বেঁচে থাকতে শামসুর রহমান খান শাজাহান ভাইকে সব সময় পাওয়া যেত। কিন্তু কেন যেন এবার তাদের পাওয়া যায়নি।

- Advertisement -

সত্যিকারেই আমরা কিছুটা বোকাসোকা ধরনের। স্বাস্থ্য শাস্ত্রে লম্বা চওড়া মানুষ কিছুটা সরল সোজা হয়। সেই অর্থেও হয়তো কিছুটা সোজাপানা দেহমনে আছে। তাই অনেক জিনিসই সোজাভাবে ভাবার চেষ্টা করি। এই কদিন আগে প্রিয় বোন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। দুই মেয়ে এবং স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলাম। অসাধারণ মধুর ব্যবহার করেছেন। অনেক দিন পর তিনি ডেকেছিলেন। একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা ডাকলে না করার সাধ্য কার? এমনিতেই জেনেশুনে কারও সঙ্গে বিরোধ করতে চাই না। ঠিক সেই সঙ্গে কারও স্বার্থের জন্য ন্যায় ও সত্যের প্রশ্নে কখনো আপস করি না। বোনের সঙ্গে দেখা হওয়া কথা হওয়ার সত্যিই অনেক প্রভাব পড়েছে। পড়াই স্বাভাবিক। ’৭২-এর ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র বিছিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে বোনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। উনি দুই রিংয়েই ফোন ধরেছিলেন। মনে হয় না আমার ফোন তার কাছে সেভ করা আছে। এখন হতে পারে, কিন্তু সেদিন ছিল বলে মনে হয়নি। কিন্তু তিনি দুই রিংয়েই ফোনটি ধরেছিলেন। ‘হ্যালো’ বলতেই বজ্র বলছি বলেছিলাম। বজ্র শুনে প্রিয়জনরা যেভাবে সাড়া দেন তিনিও দিয়েছিলেন। বোনকে বলেছিলাম, ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ পিতা মাতৃভূমিতে ফিরে অস্ত্র নিতে টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে সেদিন ভয় করে অনেকে যাননি। গুজব রটে ছিল পিতা টাঙ্গাইল গেলে তাঁর কাছ থেকে আমরা সব ক্ষমতা নিয়ে নিব। তাই কেউ যাননি। প্রধান সেনাপতি যাননি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের আইজি, অন্যান্য জাতীয় নেতৃবৃন্দ কেউ না। তবু অসাধারণ সে অনুষ্ঠানে তার চেয়ে অসাধারণ পিতার মতো ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাঙা রাস্তায় ধূলিঝড় উড়িয়ে সড়কপথে তিনি টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। কিন্তু বিকালে হেলিকপ্টারে ফিরেছিলেন। রাসেল এবং জামাল আমার পাশে সে রাত কাটিয়ে ছিল। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ এবং শেখ শহীদ সড়কপথে ফিরেছিলেন। সেই দিনটিকে টাঙ্গাইলবাসীর সামনে এবং সবাইকে জানান দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করাই ছিল শহীদ মিনারের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বোন হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এবং প্রবীণ নেতা আমির হোসেন আমুর সঙ্গে দাওয়াত নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছিলাম। আমু ভাই বলেছিলেন, ‘আমার যাওয়ার খুবই ইচ্ছে। কিন্তু এখন শরীর সাহায্য করে না।’ তাই বোনকে বলেছিলাম মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এবং আমির হোসেন আমু ভাইকে বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র বিছিয়ে দেওয়ার অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য বলতে। তিনি বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, আমি দেখছি।’ ঘণ্টাখানেক পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী প্রিয় আ ক ম মোজাম্মেল হক ফোন করেছিলেন, ‘ভাই প্রাইমমিনিস্টারের সঙ্গে কথা হলো, আমি যাব।’ সেই রাতে টাঙ্গাইলের কয়েকজন যোদ্ধা, বীরপ্রতীক হাবিবুর রহমান তালুকদার, বীরপ্রতীক মো. আবদুল্লাহর সঙ্গে মন্ত্রীদের বাড়িতে গিয়েছিল। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়রা এবং আমির হোসেন আমু তাদের সঙ্গে অসাধারণ সৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছেন। টাঙ্গাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সাধ্যমতো আন্তরিক চেষ্টা করেছিল। সমাবেশও সে জন্য সম্মানজনক হয়েছে। অনুষ্ঠানে যাদের যাওয়ার কথা ছিল তারা সবাই গিয়েছিলেন। শুধু আমাদের প্রিয় ভাতিজা আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার যেতে পারেনি অসুস্থ থাকার কারণে। তবু আমার মনে হয় ঠিক সময় জানাতে পারলে কায়সারও যেত। অনেক দিন পর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। বড় ভালো বলেছেন। আমাদের ওপর দিয়ে অনেক জোয়ারভাটা গেছে। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকীর কাছে আমরা কেউ কিছু না এই সাদা কথাটা অনেকেই মানতে চায়নি, এখনো মানে না। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক আমি জানি আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, লতিফ সিদ্দিকী ওভাবে দুর্বার গতিতে আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের বিরুদ্ধে এগিয়ে না গেলে আমরা কেউ নেতা-কর্মী হতাম না। আমাদের এলাকায় অনেক বড় বড় নেতা ছিলেন। হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক, ডা. আলীম আল রাজী, জননেতা আবদুল মান্নান, হাতেম আলী খান, হাতেম আলী তালুকদার, শামসুর রহমান খান শাজাহান। যে শামসুর রহমান খান শাজাহানের বক্তৃতা শুনে রণদা প্রসাদ সাহা মির্জাপুরে ডেকে নিয়ে হাজার টাকা উপহার দিতেন। তখনকার হাজার টাকায় এক খাদা জমি কেনা যেত। ১৬ পাখিতে এক খাদা। এক খাদা মানে ৭৫০ ডিসিমল। যার দাম হবে এখন দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। করটিয়া কলেজের ভিপি ফজলুল করিম মিঠু, আল মুজাহিদী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, শাজাহান সিরাজ, আতিকুর রহমান সালু, হাজেরা সুলতানা, রহিমা সিদ্দিকীসহ আরও বেশ কয়েকজন। আমি নিজেই দেখেছি, শাজাহান সিরাজ আমাদের বাইরের ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিৎকার ফাৎকার করতেন।

কীভাবে বক্তৃতা করতে হয় লতিফ ভাই শিখাতেন। তিনি শেষ পর্যন্ত ওস্তাদমারা শিষ্য হয়েছিলেন। ’৬২, ’৬৩, ’৬৪-এর দিকে যেভাবে সবাই এক আত্মা এক প্রাণ ছিলেন আস্তে আস্তে কেন যেন একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে চলে গেলেন। জনাব লতিফ সিদ্দিকী জেল খাটার দিক বেছে নিলেন। শাজাহান সিরাজ তরতর করে এগিয়ে গেলেন। এমনকি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় চার ছাত্রনেতার মধ্যে একজন। সেখানে লতিফ সিদ্দিকী অনেক দূর পিছিয়ে পড়লেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা বদিউজ্জামান খান এবং লতিফ সিদ্দিকী করেছিলেন। ফজলুর রহমান খান ফারুক করেননি। তিনি অনেকের আগে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। গোড়ান-সাটিয়াচরা ইপিআরদের নেতৃত্বে যে যুদ্ধ হয়েছে সেখানে ১৪-১৫ জন যোদ্ধা শহীদ হয়েছে। শহীদরা পদক পেল না, যিনি ঘুরতে গিয়েছিলেন তিনি পদক পেলেন এ তো ভালো কথা হতে পারে না। আমি সব সময় বলেছি, এখনো বলি, মিথ্যার ওপর ভর করে বেশি সময় টিকে থাকা যায় না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য তাকে পদক দিলে তাহলে তো আরও অনেককে দিতে হয়। সেখানে মান্নান ভাই, শাজাহান ভাই, হাতেম আলী তালুকদার, ব্যারিস্টার শওকত আলী এরা বাদ পড়ে কোথা থেকে? প্রত্যক্ষ যুদ্ধ পরিচালনা এ জন্য কাউকে পদক দিলে শুরুর দিকে বদি ভাই, লতিফ ভাই এমনকি সামাদ মামার ছেলে আসাদুজ্জামান খান অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তারা বাদ পড়েন কী করে? যে যাই বলুন, ভবিষ্যতে এগুলো বাতাসে উড়ে যাবে। তাই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। আমার বিরোধীরা অনেকেই অনেক সময় বলার চেষ্টা করেন আমি কোথায় যুদ্ধ করেছি। এটা জানতে হলে পাকিস্তানিদের জিজ্ঞেস করলেই তারা জানতে পারবেন। টাঙ্গাইলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছিলেন বদিউজ্জামান খান এবং লতিফ সিদ্দিকী। প্রথম জয় বাংলা বাহিনী হয়েছিল। যেটায় কর্তৃত্ব নেতৃত্ব ছিল ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের। তারা যা বলতেন তাই আমরা করতাম। তখন আমাদের নেতা লতিফ সিদ্দিকী। ২৬ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল সমস্ত কর্তৃত্ব নেতৃত্ব ছিল তাদের। আমরা তাদের কর্মী বা যোদ্ধা ছিলাম। ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত কালিহাতীর যুদ্ধ লতিফ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছে। তারপর লতিফ সিদ্দিকী ভারতে চলে গেলে দিশাহারা আমি উন্মাদের মতো ঘুরতে ঘুরতে ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো একলা চলো একলা চলো রে’ তাই একলা চলা শুরু করেছিলাম। আল্লাহ রহমত করেছিল দেশবাসী ভরসা পেয়েছিল তাই সবাই পাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে কাউকে আগে ঠেলে দিয়ে পিছনে থাকিনি। তাই প্রথম প্রথম আমাদের অনেক নেতা সহজভাবে মানতে না পারলেও হানাদারদের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর হিম্মত ছিল না তাই পিছনে থেকেছে মেনে নিয়েছে। ঠিক সেই সময় কেন যেন একেবারে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের বিপুল আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তাই অতি অল্প অস্ত্রে বিপুল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আর আল্লাহ যখন কাউকে দয়া করে তখন কেউ বুঝতেও পারেন না। কাদেরিয়া বাহিনীর ব্যাপারেও সে রকম হয়েছিল। তা না হলে অত বড় বড় বিশাল জাহাজ আমাদের হাতে মারা যাবে কী করে? জাহাজের ওপরে পাকিস্তানের মেশিনগান ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, পিছনে চালানোর কোনো লোক ছিল না। আমাদের গুলিতে মেশিনগানের ট্রিগার ধরার আগেই পাকিস্তানি বীরেরা খতম হয়ে গিয়েছিল। লাখো যোদ্ধার জন্য অস্ত্র পেয়েছিলাম সেখান থেকে। পাকিস্তানিরা জানত কত মারাত্মক অস্ত্র ছিল সেখানে। তাই ঘাবড়ে গিয়েছিল এবং তাদের ঘাবড়ে যাওয়া বিনা কারণে ছিল না। আগস্টের পর সেপ্টেম্বর থেকে কোনো যুদ্ধেই পাকিস্তান হানাদাররা আমাদের বিরুদ্ধে এঁটে উঠতে পারেনি।

১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি সত্য, যে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত হানাদারদের আজ্ঞাবহ ছিল ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের পর তারাই হয়েছিল বাংলাদেশের কর্মচারী। মস্ত বড় গলদ সেখানে। তখনো বঙ্গবন্ধু ছিলেন আমাদের থেকে বহু দূরে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। যা ক্ষতি হওয়ার তখনই হয়ে গিয়েছিল। যারা পাকিস্তান রক্ষা করার চেষ্টা করেছে তাদের সে সময় ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলে বাংলাদেশের পরিণতি এমন হতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পথ কেউ প্রশস্ত করতে পারত না। ২৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে অস্ত্র জমা দেওয়ার অনুষ্ঠান খুবই সার্থক হয়েছে। যা সত্য ফজলুর রহমান খান ফারুক সম্পর্কে তা বলায় তিনি নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হতে পারেন। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক কাদেরিয়া বাহিনীর একজন শিক্ষিত সদস্য। তিনি মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি একজন ভদ্রশালীন মানুষ। যখন যেখানে দেখা হয়েছে পিতার মতো সম্মান দেখিয়েছে, এখনো দেখায়। ফজলুর রহমান খান ফারুককে নিয়েও তার সঙ্গে আমার টেলিফোনে কথা হয়। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, মন্ত্রণালয় থেকে যেখানে মন্ত্রী যাচ্ছেন দল থেকে যেখানে প্রতিনিধি যাচ্ছেন সেখানে তাদের যাওয়ায় কারও অনুমতির কেন প্রয়োজন এটা তো আমি বুঝতে পারি না। যা হোক ওইটুকুই থাকা ভালো। ইদানীং অনেক পত্রিকায় আমাদের কথা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে না। তাই অনেক ক্ষেত্রে সঠিক লিখতেও পারে না। ছন্দপতন হয়। আমি তো আওয়ামী লীগ করি না তাই আওয়ামী লীগের সমালোচনা করার আমার ষোলআনা অধিকার আছে। আমি সব এমপিকে অযোগ্য বলিনি। আমি বলেছি, অনেক এমপির যোগ্যতার অভাব আছে। বেশি দূর যাওয়ার দরকার কী? কালিহাতী, টাঙ্গাইল-৪ ’৫৪ সালে এমপি ছিলেন আমির আলী খান।

তার আগে আবদুল হামিদ চৌধুরী। পরেও আবদুল হামিদ চৌধুরী। কালিহাতীর এমপি হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের স্পিকার হয়েছিলেন। ’৭০-এর নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, এমএনএ অধ্যাপক হুমায়ুন খালিদ। ’৭৩-এ লতিফ সিদ্দিকী। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শাজাহান সিরাজ। একমাত্র মহিলা সংসদ সদস্য যিনি সরাসরি নির্বাচনে জয়লাভ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাদের ভাবি লতিফ সিদ্দিকীর স্ত্রী লায়লা সিদ্দিকী। এ দেশে বহু মহিলা সংসদ সদস্য হয়েছেন। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত আরও আরও অনেক জায়গায়। কিন্তু তারা সবাই হয়েছেন দলীয় ব্যানারে, স্বতন্ত্র হিসেবে নয়। এখন সেখানে সংসদ সদস্য সোহেল হাজারী। তাকে নিয়ে অনেক কথা আছে। আমি না হয় নাই বললাম। পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনে তাকে নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। আমাকে দূরে গালাগালি করে কি না জানি না। কিন্তু সামনা-সামনি অসম্ভব সম্মান দেখান। তাই আর কিছু বলতে বা লিখতে গেলাম না। এরকম প্রায় অনেকের ক্ষেত্রে। হ্যাঁ এটা সত্য, টাঙ্গাইল-১ মধুপুর যেখানে ’৭০-এ এমপি ছিলেন ড. নিজামুল ইসলাম। তারপর আবদুস সাত্তার, আবুল হাসান চৌধুরী। তারপর নিজামুল ইসলাম, খন্দকার আনোয়ারুল হক, ড. আবদুর রাজ্জাক। এখানে তো কাউকে আমরা অযোগ্য বলিনি। যারা অযোগ্য তাদেরই বলেছি। তাই এ নিয়ে ছটফট করার কোনো মানে হয় না। লেখক : রাজনীতিক

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles