-3.5 C
Toronto
সোমবার, জানুয়ারী ৩০, ২০২৩

ফারদিন আত্মহত্যা করলে বুশরা কেন জেলে?

ফারদিন আত্মহত্যা করলে বুশরা কেন জেলে?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশ আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি র‌্যাব-পুলিশের। এ দাবির সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে একমত পোষণ করতে পারেনি ফারদিনের বাবা নূরউদ্দিন রানা ও তার সহপাঠীরা।

- Advertisement -

তাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে থাকা তথ্য-প্রমাণ দেখতে বৃহস্পতিবার গোয়েন্দা কার্যালয়ে যান বুয়েটের একদল শিক্ষার্থী। তথ্য প্রমাণ দেখে ডিবির বক্তব্যের সঙ্গে অনেকটাই একমত হয়েছে ফারদিনের সহপাঠীরা।

তবে ফারদিনের বাবা এখনো আত্মহত্যার বিষয়টি মানতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন-হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কেন ফারদিনের বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে গ্রেফতার করা হলো?

কেন তাকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হলো? রিমান্ডে বুশরার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত কোনো তথ্য না পাওয়ার পরও তাকে কারাগারে আটক রাখার জন্য আদালতে আর্জি (আবেদন) জানানো হলো। পুলিশের ওই আবেদনের কারণেই এখনও জেলে আছেন বুশরা। এতে তার সামাজিক, পারিবারিক ও শিক্ষা জীবনে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি বুশরার পরিবারের সদস্যদের।

মামলা দায়েরের আগে বুশরাকে দুদিন ধরে দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি ও রামপুরা থানা পুলিশ। ওই সময় তার কাছে কোনো ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।

তারপরও মামলা দায়েরের ২ ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। জানতে চাইলে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক বলেন, বাদী অনেক সময় ভুল করে বা ইচ্ছে করে আসামির তালিকায় এমন নাম দেন, যিনি অপরাধে জড়িত নন। সেজন্য তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন ফারদিনের মামলার তদন্ত অনেকটাই শেষ পর্যায়ে বলে গণমাধ্যমে দেখছি। এক্ষেত্রে দ্রুত ফাইনাল রিপোর্ট দিলে বুশরার মুক্তি ত্বরান্বিত হবে।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, দেশে অপরাধের বিচার ব্যবস্থার মধ্যে তদন্ত একটি দুর্বল জায়গা। দুর্বল চার্জশিটের কারণে অনেক ভুক্তভোগী সঠিক বিচার পান না।

বুশরার মা মোসাম্মৎ ইয়াসমিন বলেন, চার বছরের বেশি সময় ধরে বুশরা ও ফারদিনের মধ্যে পরিচয়। বিতর্ক প্রতিযোগিতা নিয়ে কথা হতো তাদের। পরে তাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে ফোনে ও মেসেঞ্জারে নিয়মিত কথা হতো। তাও জানত বুশরার পরিবার। দুজনের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু একটা ঘটনার পর বুশরাকে আসামি করে মামলা করা হলো। তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে আনা হলো। এখন জানতে পারছি ফারদিন আত্মহত্যা করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত। তার সহপাঠীরা তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে সেটাও দেখার বিষয়। মেয়েটা হয়তো আর আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারবে না।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, ফারদিন নিখোঁজ ও লাশ উদ্ধারের পর দুই দফা কথা বলা হয় বুশরার সঙ্গে। কিন্তু তার কাছ থেকে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। বিষয়টি ফারদিনের বাবাকে জানানো হয়। কিন্তু তিনি বুশরাকেই আসামি করে মামলা করবেন বলে গোঁ ধরেন। এক্ষেত্রে পুলিশ অনেকটা বাধ্য হয়েই বাদীর লিখে দেওয়া অভিযোগ গ্রহণ করে এবং বুশরাকে গ্রেফতার করে।

তিনি বলেন, ঘটনার পর আমরা কখনোই বুশরাকে দোষী বলিনি। তার কাছ থেকে শুধু ফারদিনের হতাশার কথা জানতে পেরেছি। এ কারণে আমরা তাকে দ্বিতীয় দফা রিমান্ডের আবেদন করিনি। এখন দ্রুতই এই মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হবে। একই ধরনের তথ্য জানিয়ে রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, বাদীর জেদের কারণেই বুশরাকে আসামি করে মামলা নেওয়া হয়েছিল।

ডিবি প্রধান বলেন, নিখোঁজ হওয়ার আগে ফারদিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একা একাই ঘুরে বেড়িয়েছেন। পারিপার্শ্বিক বিষয় দেখে মনে হয়েছে তিনি আত্মহত্যা করবেন সিদ্ধান্ত নিয়েই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সবকিছু মিলিয়েই আমরা সিদ্ধান্তে এসেছি।

হারুন অর রশীদ বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে লেগুনায় ডেমরার সুলতানা কামাল সেতুর একপাশে তিনি নামেন। তিনি চনপাড়ার দিকে যাননি, সেখানে কোনো ঘটনাও ঘটেনি। এ বিষয়ে বুয়েটের ৪০ জন শিক্ষার্থী এসে তিন ঘণ্টা আমাদের সঙ্গে কথা বলেছে।

তিনি আরও বলেন, ফারদিন সেদিন রাতে বাবুবাজার ব্রিজ ও সুলতানা কামাল ব্রিজে যান। অথচ গত দুই বছরেও তিনি এসব এলাকায় যাননি। ফারদিন দুই বছরে ফোনে ৫২২টি নম্বরে কথা বলেছেন।

ফারদিন বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন উল্লেখ করে হারুন অর রশীদ বলেন, তিনি বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় হতাশার কথা বলেছেন। এক বান্ধবীকে লিখেছেন, ‘৩০ বছরের বেশি কারও বাঁচার দরকার নাই।’ আবার কাউকে লিখেছেন, ‘যদি মারা যাই, বন্ধু সাজ্জাদ কষ্ট পাবে’। আরেকজনকে লিখেছেন, ‘কোনো একদিন শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবে আমি আত্মহত্যা করেছি।’ ফারদিন শুক্রবারই আত্মহত্যা করেছেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডিবিপ্রধান বলেন, ফারদিন আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন। তার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছিল, কিন্তু কাউকে কিছু বলেননি। ফারদিন লিখেছেন, ‘৯৫ শতাংশ মানুষের জীবন পরিবার দ্বারা সীমাবদ্ধ।’

এদিকে ফারদিনের আত্মহত্যার সপক্ষে ডিবি পুলিশ যেসব তথ্য-প্রমাণ ও আলামাত দেখিয়েছে সেগুলো প্রায় সবকিছু ঠিক আছে বলে জানিয়েছে সহপাঠীরা। তবে কিছু জায়গায় গ্যাপ রয়েছে বলে তারা মনে করছে। বৃহস্পতিবার ডিবি অফিস থেকে বেরিয়ে বুয়েট শিক্ষার্থীরা বলেন, প্রাইমারি গ্যাপ হলো যে ব্রিজে ফারদিনকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে সেই ব্রিজে তিনি (ফারদিন) কীভাবে গেল, কার সঙ্গে গেল?

এক বুয়েট শিক্ষার্থী বলেন, ডিবির এভিডেন্স সবকিছুই প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। তবে ফারদিনকে ব্রিজের কাছে নামিয়ে দেওয়ার পর হেঁটে সে ব্রিজের মাঝখানে গিয়েছে। তার সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, ডিবি প্রথম দিন থেকে যে কাজ করছে, তা আমাদের দেখিয়েছে। তাদের অগ্রগতির ধরণ দেখে আমরা সন্তুষ্ট।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ফারদিনের আত্মহত্যার শতভাগ মোটিভ নেই। যেসব এভিডেন্স আছে, তাতে সারকামস্ট্যান্সেস (স্থান বা অবস্থা) এভিডেন্স নেই। এ জায়গায় আরেকটু কাজ করা যেতে পারে।

এদিকে ফারদিন নূর পরশের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মানতে নারাজ ফারদিনের বাবা কাজী নূরউদ্দিন রানা। তিনি বলেছেন, আমার ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না। যদি ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয় তাহলে সেটার ওপর আমি আমি নারাজি আবেদন করবো। তিনি বলেন, ফারদিনের আত্মহত্যার বিষয়ে তদন্ত সংস্থা যে তথ্য-প্রমাণ দেখিয়েছে সেটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তদন্তকারী সংস্থা আমাদের দেওয়া কোনো তথ্য-প্রমাণ আমলে নেয়নি।

গত ৪ নভেম্বর রাতে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় বান্ধবী বুশরাকে বাসায় যাওয়ার জন্য এগিয়ে দেন বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন। এরপর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। এরপর গত ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ৯ নভেম্বর রাতে ডিএমপির রামপুরা থানায় ফারদিনের বাবা বাদী হয়ে বুশরাসহ অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি।

সূত্র : নতুন সময়

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles