12.7 C
Toronto
বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২

আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস

- Advertisement -

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনের ৭ নম্বর রেজুলেশন ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। গণতন্ত্র চর্চাকে উৎসাহিত এবং গণতন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য এই বিশেষ দিনটি পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর থেকেই প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০২২ সালের প্রতিপাদ্য হলো, গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।

২.
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের পটভূমি হলো,১৯৯৭ সালে ফ্রান্সের রাজনীতিকদের মধ্যে সংলাপের মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অন ডেমোক্রেসি’ নামের একটি প্রস্তাব আনে। এতে গণতন্ত্রের নীতি,আদর্শ,উপাদান,গণতান্ত্রিক সরকারের চর্চা এবং গণতন্ত্র সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরির বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হয়। ফ্রান্সের এ প্রস্তাবের আগেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়। ফিলিপাইনে ফার্ডিনান্ড মার্কোসের ২০ বছরের স্বৈরশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর এই সম্মেলন হয়। সম্মেলনটির নাম ছিল দি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন নিউ অ্যান্ড রিস্টোর্ড ডেমোক্রেসিজ তথা আইসিএনআরডি। ২০০৬ সালে আইসিএনআরডির ষষ্ঠতম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় কাতারের রাজধানী দোহায়। পরবর্তীকালে কাতারের নেতৃত্বে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয়। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ ও প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। পরে ফ্রান্সের আইপিইউ ১৫ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস হিসেবে নির্ধারণের প্রস্তাব করলে তা ২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। সে সময় গণতন্ত্রের সকল প্রকার দায় দায়িত্বপূর্ণ প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ বা পার্লামেন্টকে ঘোষণা করা হয়।

৩.
বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক জনপ্রিয় সরকার ব্যবস্থা হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। রাষ্ট্র পরিচালনার হরেকরকম মতাদর্শের মধ্যে জনসম্পৃক্ততায় একালের জনপ্রিয় মতবাদ হচ্ছে গণতন্ত্র। গণতন্ত্র এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সমান ভোট বা অধিকার আছে। গণতন্ত্রে আইন প্রস্তাবনা, প্রণয়ন ও তৈরির ক্ষেত্রে সব নাগরিকের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে, যা সরাসরি বা নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হয়ে থাকে। গণতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ Democracy শব্দটি এসেছে Demos এবং Kritos /Kratos দুটি গ্রিক শব্দ হতে। অর্থাৎ Demos অর্থ হলো জনগণ আর Kritos/Kratos অর্থ শাসনক্ষমতা বা কর্তৃত্ব। সুতরাং ব্যুৎপত্তিগত অর্থে গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন। গণতন্ত্রের জন্ম প্রাচীন গ্রিস দেশের নগরে হলেও আধুনিক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে ইংল্যান্ডে। বর্তমানে গণতন্ত্রের বিকাশ এতটাই সাফল্য লাভ করেছে যে, আধুনিক সভ্যতা গণতান্ত্রিক সভ্যতায় পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। কেননা, কাল ও স্থানভেদে গণতন্ত্রের পার্থক্য ঘটে। তাই বলা হয়ে থাকে- জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসনই গণতন্ত্র। (This nation under God shall hear a new birth of freedom and that Government of the people, by the people and for the people shall not perish from earth.) আব্রাহাম লিংকনের এই লাইনটি গণতন্ত্রের সর্বজনীন এবং সর্বাধিক সমর্থিত ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা হিসেবে বহুল আলোচিত। আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গের জাতীয় সমাধিস্থলে এক ঐতিহাসিক বক্তৃতায় গণতন্ত্রের এই শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞাটি প্রদান করেন।

৪.
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত সর্বজনীন ঘোষণার ২১(৩) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি; এই ইচ্ছা সর্বজনীন ও সমান ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নৈমিত্তিকভাবে এবং প্রকৃত নির্বাচন দ্বারা ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট অথবা অনুরূপ অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ আর আমাদের সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ সংবিধানের আলোচ্য অনুচ্ছেদের প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ নানামত দিয়ে থাকেন। আন্তর্জাতিকভাবে গণতন্ত্র দিবস সার বিশ্বে নিয়মিতভাবে পালিত হলেও বিশ্বের কত শতাংশ মানুষ গণতন্ত্রের সুফল পাচ্ছে সেই প্রশ্নও বিবেচ্য বিষয়। ২০২২ লন্ডনভিত্তিক দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গণতন্ত্র সূচকে এক ধাপ এগিয়ে ৭৫তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এ সূচক প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের। ১৬৫টি দেশ ও ২টি অঞ্চল নিয়ে তৈরি করা হয়েছে ২০২১ সালের এই সূচক। সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৫ দশমিক ৯৯। আগের বছরেও একই স্কোর নিয়ে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭৬তম। এর আগের বছর ছিল ৮০তম। এ হিসেবে সূচকে ধারাবাহিক উন্নতির পথে রয়েছে বাংলাদেশ। সূচকে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ৪৬ ও ১০৪। সূচকে শীর্ষ স্থানে আছে নরওয়ে। দেশটির স্কোর ৯ দশমিক ৭৫। উল্লেখ্য,নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, নাগরিক অধিকার,সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ- এসব মানদণ্ডে প্রতিবেদন তৈরি করে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট।

৫.
মানুষ জন্মগতভাবে সমমর্যাদা ও সম-অধিকার ভোগ করার অধিকার রাখে; জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষেরই বিয়ে, পরিবার গঠন, সম্পত্তি অর্জন এবং সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার রয়েছে। প্রতিটি মানুষের রয়েছে স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার, ভোট প্রদানের, চিন্তার ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার। রাষ্ট্র থাকলে নাগরিক থাকবে, রাজনীতি ও রাজনীতিক থাকবে, সরকার গঠনের পদ্ধতি থাকবে, মতবাদ থাকবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে; রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থা সম্পর্কিত এসব বিষয়ে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ থাকবে। মানুষ স্বাধীনভাবে যার যার অবস্থান থেকে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। এসব করতে পারার নাম গণতন্ত্র। তাই জনকল্যাণমূলক একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। যা পরস্পরে ঘনিষ্ঠ ও একে অপরের পরিপূরক। মূলত গণতন্ত্রের প্রধানতম লক্ষ্যই হচ্ছে মানবাধিকার। তাই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও অসম্ভব।

৬.
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউই অস্বীকার করেন না যে, জ্যামিতির মতো গণতন্ত্রেরও সহজ সড়ক নেই; গণতন্ত্রের পথে কোনো রাষ্ট্রের পথচলা কখনোই একরৈখিক নয়, সব সময়ই তা আঁকাবাঁকা- দুস্তর আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ; এ এক দীর্ঘ আর কষ্টকর ভ্রমণ- যার পথে পথে পাথর ছড়ানো। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপস্থিতি, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, সাংবিধানিক চর্চার ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি, চিন্তার বহুত্ববাদিতা- যা গণতন্ত্রের অন্যতম অনুষঙ্গ- একটি রাষ্ট্রে তার সঠিক চর্চা নিশ্চিত করা মোটেই সহজ কোনো বিষয় নয়। গণতন্ত্রেরই আরেক অনুষঙ্গ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। বলা হয়, গণতন্ত্রেরে জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তিমানুষ ও নেতৃত্বের ভূমিকা আর্থসামাজিক পূর্বশর্তের চেয়ে কম নয়। একই সঙ্গে জনগণ এবং ব্যক্তিকে সংগঠিত করে যে রাজনৈতিক দল, তার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

৭.
প্রচলিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে গণতন্ত্রই হলো এ যাবৎকালে সর্ব জননন্দিত প্রকৃষ্ট শাসনব্যবস্থা,এর শ্রেষ্ঠত্ব বিরোধ-বিতর্কের ঊর্ধ্বে যদিও নয়, তবে অধিকাংশেরই কাম্য শাসন ব্যবস্থা। আমাদের রাজনীতিতে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চেতনা আরও বিকশিত হোক, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা বৃদ্ধি পাক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে আমাদের যেমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, তার ধারাবাহিকতা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারেও বজায় রাখতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই মানবাধিকারের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করে তা মোকাবিলায় জনগণ, বিশেষ করে সুশীল সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। সবশেষে প্রত্যাশা- গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা হোক বিশ্বের প্রতিটি দেশে। সারা বিশ্বেরই ছড়িয়ে পড়ুক গণতন্ত্রের সুফল, প্রতিষ্ঠিত হোক মানুষের অধিকার, মর্যাদা লাভ করুক মানবাধিকার।

(তথ্যসূত্র : বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ইন্টারনেট)
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা

Related Articles

Latest Articles