8.6 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

কালজয়ী মহাকাব্য,সনেট রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত

- Advertisement -

মাত্র ৪৯ বছর বয়সেই পৃথিবীর মায়া চিরতরে ত্যাগ করে ওপারে বা ফেরার দেশে চলে যান উনিশ শতকের বাংলায় নব জাগরণের শ্রেষ্ঠ সন্তান পত্রকাব্য, নাটক, প্রহসন, সনেট এবং মহাকাব্য রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

জমিদার পরিবারে পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ও মাতা জাহ্নবী দেবীর ঘরে যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ‘কপোতাক্ষ নদের’ তীরবর্তী সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ সালের ২৫ শে জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৭৩ সালের ২৯ শে জুন তিনি কলকাতার আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন অবস্থায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

কপোত মানে কবুতর। কবুতরের চোখের পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ বা পরিস্কার। কপোতাক্ষ নদের পানি সেরকম ছিল বিধায় ওই নদের নাম ‘কপোতাক্ষ’ নদ। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, ধূলোবালি, সবুজের সমারোহ স্বনামধন্য নদটির ছুটে চলা, সুষমায় ভরা শৈশবের বীজ,পল্লী প্রকৃতির মেহনতি আপামর জনতার আকর্ষণ, মাটির প্রতি অসীম ভালোবাসা, উদার মন মানসিকতা সাথে মানবিকতাই ইত্যাদি ছিল তাঁর মনের গহীনে লুকায়িত বীজ বা শেকড়। শেকড়ের মূল কাজ হল গাছটির অস্তিত্ব ধরে রাখা, যেখানে সুপ্তভাবে চিরঅটুট থাকে এক শক্তিশালী বন্ধন। ছোট্ট শিশুরা শত প্রলোভন ভুলে গিয়ে জননীর কোলে বারবার ফিরে আসে,ঠিক তেমনি প্রথম যৌবনে মাতৃভাষা বাংলা ,নিজ ধর্ম, নিজ দেশ,স্বজাতি (বাঙালী) এবং প্রথম স্ত্রী সাথে সন্তানদের ভুলে গিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে বিদেশে পাড়ি দেন। অনেক কিছুই হারিয়ে মারাত্বক অর্থকষ্টে সারাজীবন ভুগতে থাকেন অথচ তিনি জন্মেছিলেন সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং এর সাথে ছিল অলৌকিক প্রতিভা। সেই প্রতিভার দীপ্তি ছিল ভীষণ প্রখর।

বাঙালী জাতির অহংকার কালজয়ী সাহিত্যিক, নাট্যকার মাইকেল ছিলেন উচ্চশিক্ষিত ব্যারিস্টার। তিনি প্রচুর টাকা উপার্জন করলেও স্বভাবজাত কারণে সেই টাকা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর অমর মহাকাব্য “মেঘনাদবধ “(১৮৬১)এবং ‘বঙ্গভাষা’ ও ‘কপোতাক্ষ নদ’ সনেটগুচ্ছ (১৮৬৬) সালে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যাংশের প্রতিটি পঙক্তি চৌদ্দ মাত্রায় এবং ৮ + ৬ মাত্রায় দুটি পর্বে বিভক্ত। বাংলা ভাষায় প্রথম রচিত, সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি, মহাকাব্য “মেঘনাদবধ” রচনাই তাঁকে অমরত্ব দান করেছে। এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন। অমিত্রাক্ষর ছন্দের ব্যবহার বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম প্রচলন করেন। যা এক যুগান্তকারী ঘটনা। ‘বঙ্গভাষা’ এবং ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় তিনি নিজের জীবনের হারানো সোনালী অতীত ভুলে গেলে বা অন্য ভাষায় সাহিত্য চর্চার ফল কী ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে তা অকপটে অকাতরে স্বীকার করেছেন।

পরভাষায় কবি হওয়ার প্রয়াস তাঁর ব্যর্থ হয়েছে। নিজের ভুল ভ্রান্তি বা বিভ্রান্তি হৃদয় থেকে মুছে ফেলে মায়ের মুখের ভাষায় পুনরায় সাহিত্য চর্চা তাঁকে সম্মানিত করেছে।ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে বসে শৈশব কৈশোরের স্মৃতি বিজড়িত নদের পবিত্র জল এবং এর শব্দ বা ধ্বনি তিনি প্রতি মুহুর্তে অনুভব করতেন। মাতৃভাষা, জন্মভূমি কবির মনে বেদনা বিধূর স্মৃতি কাতরতা জাগিয়ে তুলেছিল বলেই তিনি সেগুলো থেকে মুক্ত হতে পারছিলেন না। সেই নদের তীরে ফিরে আসার জন্য বারবার প্রাণভরা মিনতি জানিয়েছিলেন। যদি ফিরে না আসেন তাহলে যেন তাঁর অমর কাব্যের কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

স্বধর্ম ত্যাগ করার জন্য তাঁর ব্রাক্ষণ পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। ১৮৬২ সালে কবি তাঁর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে শেষ বারের মত বজরায় করে মা এবং নিজ বাড়ি দেখতে আসেন। তাঁর পিতা তাঁকে তাঁর মায়ের সাথে দেখা এবং বাড়ীতে যেতে অনুমতি দেন নি। ১৪ দিন যাবৎ কাঠবাদাম গাছতলায় তাঁবু খাটিয়ে এবং বিদায় ঘাটে অবস্থান নিয়ে দু:খ ভারাক্রান্ত হ্রদয়ে ফিরে যান। সেই কপোতাক্ষ নদের তীরে বিদায় ঘাটের ফলকে খুদিত আছে “কপোতাক্ষ নদ” কবিতাখানি। ১৮৫০ থেকে ১৮৭০ সাল ছিল তাঁর সাহিত্যখ্যাতি ও যশ এর আকাশচুম্বী হওয়ার স্বর্ণযুগ। ১৮৪৯ সালে “ক্যাপটিক লেডি” কাব্যটি তিনি ইংরেজীতে লিখেন।

মহাভারতের উপাখ্যান অবলম্বনে পাশ্চাত্য রীতিতে ১৮৫৮ সালে রচনা করেন নাটক ‘শর্মিষ্ঠা”। ইয়ং বেংগলদের তাচ্ছিল্য করে ১৮৫৯ সালে দুটো প্রহসন রচনা করেন “একেই কি বলে সভ্যতা”। সে সময়ের সমাজপতিদের লাম্পট্যকে পরিহাস করে “বুড়ো সালিকের ঘারে রো” তাঁর অনবদ্য রচনা। ১৮৬১ সালে রাজপুত আখ্যান বস্তু নিয়ে বিয়োগান্ত নাটক “কৃষ্ণকুমারী” রচনা করেন। রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক গীতিকাব্য “ব্রজাঙ্গনা” ( ১৮৬১) এবং ১৮৬২ সালে রোমান কবি ওভিদের মত এগারটি পত্র নিয়ে পত্রকাব্য বীরাংগনা” লিখেন। ১৮৬১ সালে হোমারের ‘ইলিয়াড’ এর কাহিনী অবলম্বনে বাংলায় সফল নাটক রচনা করেন “হেক্টরবধ”।

তাঁর আরও রয়েছে বিশাল সাহিত্য ভান্ডার। মহাকবির ইচ্ছা ছিল আরও অনেক কিছু লিখে যাওয়ার কিন্তু সব সাধনা কি আদৌ পূরণ হয়। জীবনে পুরোপুরি সাফল্য লাভের দুর্দমনীয় প্রতিভা তাঁর বরাবরই ছিল। মেধা শক্তি বা প্রতিভা সাফল্য লাভের চাবিকাঠি বা সিঁড়ি। যা মানুষকে কেবল উপরেই নিয়ে যায় কিন্তু একসময় নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে আমাদের সবাইকে থামতে হয়। তেমনি ভাবে তিনিও থেমে গিয়েছেন। চিরতরে থেমে গেলেও তাঁর বহুমূখী লেখালেখির জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি যে স্রোতধারা বা জোঁয়ার সৃষ্টি করে গেছেন সেগুলোই তাঁকে অমরত্ব দান করেছেন।

কবির জন্মভূমি সাগরদাঁড়ি গ্রামে শ্বেত পাথরে তাঁর কবিতার পঙক্তি নজরে পড়লেই কবিভক্ত ও পর্যটকদের ক্ষণকালে দাঁড়াতেই হবে। “দাঁড়াও পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ট ক্ষণকাল!

লেখকঃ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

Related Articles

Latest Articles