11.2 C
Toronto
বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

জঙ্গি ‘ফাঁদে’ কুমিল্লার ৭ তরুণ, ‘হিজরতের’ উদ্দেশ্যে বাড়িছাড়া!

- Advertisement -

জঙ্গি ‘ফাঁদে’ কুমিল্লার ৭ তরুণ, ‘হিজরতের’ উদ্দেশ্যে বাড়িছাড়া!

১৬ দিনেও সন্ধান মেলেনি কুমিল্লা থেকে ‘নিখোঁজ’ সেই সাত তরুণ শিক্ষার্থীর। এতে ওই শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যরা দিশাহারা। সন্তানদের ফিরে পেতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন তাঁরা। তাদের সন্ধানে পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক ইউনিট মাঠে কাজ করছে।

কুমিল্লার ওই সাত তরুণকে উদ্ধারে মাঠে নেমেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক ইউনিট। এমন দুটি ইউনিটের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন, বিছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, উগ্রবাদে জড়িয়ে ওই সাত তরুণ কথিত হিজরতের জন্য নিজেরাই বাড়ি ছেড়েছে। তারা নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনের ‘ফাঁদে’ পা দিয়ে কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছে।

গতকাল বুধবার বিকেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে র‌্যাব ও পুলিশের দুজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, এইচএসসি থেকে স্নাতকে পড়া ওই তরুণদের হিজরতে উদ্বুদ্ধ করেছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। কয়েক দিনের তদন্তে এমন তথ্য জানতে পেরেছেন তাঁরা।

কর্মকর্তারা বলেছেন, কুমিল্লার এই তরুণদের আগে সিলেট অঞ্চল থেকেও বেশ কিছু তরুণ ওই জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে বাড়ি ছেড়েছিল। কুমিল্লার এই তরুণরাও এর মধ্যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বলে তথ্য রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের হাতে।

নিখোঁজ ওই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছয়জন কুমিল্লার হলেও একজন এসেছিলেন ঢাকা থেকে। ঢাকা থেকে কুমিল্লায় আসা সরতাজ ইসলাম ওরফে নিলয় (২৫) রাজধানীর ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। কুমিল্লার রানীরবাজারের পাশের অশোকতলা এলাকায় তাঁর খালা ফৌজিয়া ইয়াসমিনের বাসা। সাত তরুণের একজন নিলয়ের খালাতো ভাই কুমিল্লা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নিহাল আবদুল্লাহ (১৭)। নিলয় ওই তরুণদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়। এ জন্য অন্য তরুণদের পরিবার ধারণা করছে, নিলয়ই বাকি তরুণদের বিপথগামী করেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বুধবার সন্ধ্যায় নিহাল আবদুল্লাহর বাবা সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিলয় আমার ভাইয়ার ছেলে। ২৩ আগস্ট সে আমাদের বাসায় আসবে বলে ঢাকার বাসা থেকে বের হয়। আমরা তাকে খুবই ভালো ছেলে বলেই জানি। নিহাল ও নিলয় ধর্মভীরু। ধর্মকর্ম করে, বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে তাবলিগের বয়ান শোনে। কিন্তু ঘটনার দিন নিলয় আমাদের বাসায় আসেনি। পরে এ ঘটনা জানতে পারি। ’

সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্মভীরু হলেও নিহাল ও নিলয় জঙ্গিবাদে জড়াতে পারে না। তারা হয়তো পরিবারকে না জানিয়ে তাবলিগে গেছে। ’ বাকিটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তদন্তে বের হবে বলে মনে করেন তিনি।

নিহাল ও নিলয়ের মতো বাকি পাঁচ তরুণও ধর্মভীরু। পরিবারকে তারা মসজিদে গিয়ে তাবলিগের বয়ান শোনার কথা বলত।

২৩ আগস্ট কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়া বাকি পাঁচ তরুণ হলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল (১৭), একই কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আস সামি (১৮), কুমিল্লা সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হাসিবুল ইসলাম (১৮), ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইমতিয়াজ আহম্মেদ ওরফে রিফাত (১৯) ও একই কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের আমিনুল ইসলাম ওরফে আল-আমিন (২৩)।

গতকাল বিকেলে এ ব্যাপারে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. আফজাল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই সাত শিক্ষার্থী নিখোঁজের ঘটনায় কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় পাঁচটি এবং ঢাকায় একটি জিডি হয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়টি জাতীয় ইস্যু (জঙ্গিবাদ) হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ তরুণদের উদ্ধার এবং ঘটনার তদন্তে মাঠে কাজ করছে ঢাকা ও কুমিল্লার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক টিম। আশা করছি, দ্রুত আমরা সব কিছু জানাতে পারব। ’

র‌্যাব-১১ সিপিসি ২, কুমিল্লা কম্পানি কমান্ডার মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কয়েক দিন ধরে বিষয়টি নিয়ে খুব তৎপর। আমাদের বেশ কয়েকটি টিম মাঠে কাজ করছে। ’

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক
কুমিল্লায় গতকাল নিখোঁজ তরুণদের অভিভাবকদের সঙ্গে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা বৈঠক করেছেন।

সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ বৈঠক হয় বলে অভিভাবকদের সূত্রে জানা যায়।

এ ব্যাপারে আল-আমিনের বাবা কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সদস্যরা আমাদের সবার কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শুনেছেন। একে একে সবাই কথা বলেছে। আমরা যা জানি সব বলে দিয়েছি। ’

এ বিষয়ে জেলা পুলিশের কোনো কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। শুধু বলেছেন, আমাদের একাধিক ইউনিট মাঠে কাজ করছে।

চাঁদপুরের গিয়েছিল ওরা
নিহালের বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘২৪ আগস্ট ভোরে চাঁদপুর শহরের রেলস্টেশনসংলগ্ন চাঁদপুর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে সফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি আমাকে কল দেন। নিজেকে ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তি জানান, আপনার ছেলেসহ তার বন্ধুদের পুলিশ আমাদের হোটেলে দিয়ে গেছে। আপনি এসে নিয়ে যান। ’

সাইফুলের ভাষ্য, ওই সময় তিনি ভায়রার ছেলে নিলয়ের সঙ্গে সফিকুলের মোবাইল ফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ‘তোমার আসতে হবে না। আমরা এখনই চলে আসতেছি। ’ কিন্তু তারা ফেরেনি।

চাঁদপুর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২৩ আগস্ট দিবাগত রাত পৌনে ২টার দিকে চাঁদপুর সদর থানার নতুনবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই খায়রুল ইসলাম পাঁচটি ছেলেকে আমার কাছে এনে বলেন, তারা বাড়ি থেকে অভিমান করে চলে এসেছে। তাদের অভিভাবকদের ফোন দিয়ে জানিয়ে দেন, যাতে সকালে তারা এসে নিয়ে যান। পরদিন বুধবার সকাল ৬টায় আমার শিফট শেষ হলে আমি দিনের শিফটের ম্যানেজার হেদায়েত উল্লাহর কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে যাই। পরে শুনেছি, আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ওই তরুণরা অভিভাবকরা নিতে এসেছেন বলে বেরিয়ে যায়। পরে বিভিন্ন বাহিনীর লোকজন এসে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। ’

এ ব্যাপারে এসআই খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘ওই দিন রাতে ফাঁড়ির ইনচার্জ মিন্টু দত্ত স্যারসহ আমরা একটি অভিযানে যাচ্ছিলাম। চাঁদপুর কালীবাড়ির সামনে এই ছেলেদের ব্যাগ নিয়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তারপর আমরা তাদের হোটেলটিতে দিয়ে অভিযানে যাই। ’

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ সহিদুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

সূত্র : কালেরকন্ঠ

Related Articles

Latest Articles