22.9 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুন ২০, ২০২৪

আমাদের মিশুক মুনীর

আমাদের মিশুক মুনীর
ফাইল ছবি

মরার আবার ঠিক আছে নাকি! তুমি ক্যান্সার সার্ভাইবার বলে তুমিই মরবে তা ঠিক নেই। আমিও তোমার আগে মরতে পারি!

মিশুক মুনীর বলে ছিলো কথা গুলো। তার ছোটবেলার স্কুলের সহপাঠী বন্ধু দাঁতের ডাক্তার মন্টিকে।
মিশুক শিক্ষায় দীক্ষায় মেধা জ্ঞানে আর চলনে বলনে বিশ্ব নাগরিক। আমি চিনি তার তরুণ বয়স থেকে। বয়সে বড় হলেও আমিও তখন তরুণ। দেশের প্রধাণ বিজ্ঞাপনী কোম্পানী ‘বিটপী’র আর্ট সেকশানের সর্বের্সবা ছিলেন তখন শিল্পী আবদুল মুক্তাদীর। তিনি মিশুকের বাবা মুনীর চৌধুরীর খালাতো ভাই আবার বোনের স্বামী। ফেরদৌসী মজুমদারের বড় বোন দীলু ভাবীকে বিয়ে করে ছিলেন। বিটপীতে তাঁর হাতেই বিজ্ঞাপন জগতে মানুষ হয়েছি আমি।মুক্তাদীর ভাইয়ের সাগর জলে ডুবে মারা যাওয়া সন্তান কুশলকে নিয়েই লেখা আমার জীবনের প্রথম বই’কুশল আর মৃত্যুবুড়ো’। সেই সুবাতে গোটা মুনীর চৌধুরীর শাখায় প্রশাখা বিশাল পরিবার সবাই আমাকে আপন মনে করতো।
মিশুক ও স্ত্রী মন্জুলীর সঙ্গেও ভালো আলাপ পরিচয় থাকলেও তবু তাদের কানাডায় থাকতে আসার পর আরো বেশি ঘনিষ্ঠ হই, এই টরন্টোতে। খুব স্মার্ট বুদ্ধিদীপ্ত মানুষদের ছোট্ট কিছু অস্বস্তি দুর্বলতা থাকে মিশুকের ছিলো গাড়ি চালনায়। পশ্চিমা দেশে গাড়ি কেনা যেখানে ডাল ভাত সেখানে মিশুক গাড়ি কিনেনি,চালাতে ও আগ্রহী ছিলোনা।

- Advertisement -

ওয়াশিংটন ডিসিতে আমেরিকান কোনো টিভিতে কাজ করার সময় মাসে-পনেরো দিন পর-পর স্ত্রী পুত্রের কাছে টরন্টো বাসে আসা যাওয়া করতো। তাছাড়া টরন্টোতে মিশুকের অগুণতি শুভাকাঙক্ষী । তাই গাড়ির প্রয়োজনও ছিলোনা। যখনই লাগে যেকেউ মুহূর্তে হাজির। গ্রোসারী করা বা দূরে কাছে খাদ্য নিমন্ত্রণে যাওয়া আমাকে কল করলে আমিও সানন্দে হাজির হতাম। তেমনি এক ডিনারের নিমন্ত্রণ ছিলো টরন্টোর অঙ্গ শহর মার্খাম সিটিতে মিশুকের ছোটবেলার বন্ধু স্কুল সহপাঠী ডাক্তার মন্টির বাড়িতে। মন্টি হচ্ছেন ঢাকার মিরপুর রোড আর ধানমুন্ডি পাঁচ সড়কের ধারে তিন তলায় মন্টি ডেন্টাল ক্লিনিকের স্বনামধন্য জাপান থেকে বড় দাঁতের সার্জেন ডিগ্রীধারী ডাক্তার। মুনীর চৌধুরীর যত আত্মীয় স্বজন সবাই তার কাছেই দাঁতের সমস্যা হলে আসেন। আমাকেও মুক্তাদীর ভাই পাঠিয়ে ছিলেন। অবশ্য পরে দারুণ খাতির হয়ে গিয়ে ছিলো ডাক্তার মন্টির সাথে। দাঁতের কনো সমস্যা নিয়ে আসতে চাইলে রাতের শেষ রুগীর পরে সময় দিতেন। দাঁতের সমস্যা সেরে দিয়ে কুলি করতে বের করতেন লুকানো শিবাস রিগাল হুইস্কী। এত দামী পানীয় দিয়ে কুলি করে কি থু করে আর ফেলা যায়,সানন্দে গিলে ফেলতাম।

ডাক্তার মন্টি রমরমা ডেন্টাল ক্লিনিক এবং তার পি এইচ ডি করা স্ত্রী নীরা(মেহজাবীন চৌধুরী) এক মাত্র পুত্র সন্তান নিয়ে কানাডায় সুখে শান্তিতে থাকতে চলে আসেন। মার্খাম সিটিতে ব্যান্ড নিউ বাড়ি কেনা, কানাডিয়ান এক ক্যাথলিক নামী এনজিওর সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর হিসাবে স্ত্রীর চাকরী পাওয়া। মন্টিও দিনে এক হাসপাতালে এডমিনের কাজ আর রাতে রেয়রসন ইউনিভার্সিটিতে দন্ত সার্জান হওয়ার ক্লাশে পাঠ। ভালোই চলছিলো তাদের। বছরখানেক পরে তখন ডেনফোর্থ এভিনিউে আমার ডিজাইন এন্ড প্রিন্ট এর অফিস দুপুরে মন্টির ফোন এলো। কন্ঠ ভারী ও বিপর্যস্ত – ইকবল ভাই,আমার ক্যান্সার দ্বিতীয় স্টেজে ধরা পড়েছে। শুরু হলো সেই ক্যান্সারের সঙ্গে ডাক্তার মন্টির যুদ্ধ। কিমো থেরাপীর পালা শেষ করে শেষ পর্যন্ত পাঁচ ঘন্টার সার্জারী।

সব সেরে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময় মন্টিকে ডক্তারেরা বল্লেন – আমাদের যথাসাধ্য করেছি।যদি আরো এক বছর বেঁচে থাকেন তাহলে আরো দুই বছর!দুই বছর মানে আরো তিন বছর বাঁচবেন। তারপরেও বেঁচে থাকলে তখন পরিস্থিতি বুঝে দেখা যাবে।

বাড়ি ফেরার পর অনেক সময় নিয়ে ধীরে ধীরে খানা পিনা করেন মন্টি। পিনা এজন্যে বল্লাম রাতের খাওয়ার পর একটু রেড ওয়াইনের অনুমতি আছে। ভালো ভাবেই ছয় মাস পার হতে সেই প্রথম মন্টি ও তার স্ত্রী নীরা তাদের বাড়ীতে ডিনারে আমন্ত্রণ করলেন স্বস্ত্রীক বন্ধু মিশুক ও আমাকে। মিশুকের স্ত্রী মন্জুলী কি যেন কাজে আঁটকে যাওয়ায় মিশুককে আমরাই তার বাড়িতে থেকে তুলে ছুটলাম মার্খাম সিটি । অনেক দিনপর ডাক্তার মন্টির নতুন জীবন দেখলাম,আড্ডা হলো। দারুণ সব খাওয়া মন্টির স্ত্রী নিজেই করে ছিলেন,তাও সারা হলো। এবার বিদায়ের পালা। তখনো সেল ফোনে ছবি তোলার সুনামী আসেনি। তবে গ্রাফিক ডিজাইনের অফিস চালাই বলে কোমরে বেল্টের সঙ্গে খাপে ঝুলতো আমার ছোট ডিজিটাল ক্যামেরা। মন্টির সাথে সবার ছবি তুলতে গেলে আড়ালে আমার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে নীরা বল্লেন – প্লিজ,ইকবাল ভাই ছবি তুলবেন না। ওর মানসিক চাপ বাড়ে,ও ভাবে সহসা মারা যাচ্ছে বলেই সবাই তার সাথে স্মৃতি স্বরূপ ছবি তুলে রাখতে চাইছে। স্ত্রীর কথা মন্টির কানে চলে যায়। তিনি বলে উঠলেন করুণ হেসে – আরে মরি কিংবা বাঁচি পরে যা হয় হবে! ইকবাল ভাই ছবি তুলতে চাইলে তুলুক,ছবিতে অন্তত তোমাদের সঙ্গে থাকবো। ছবি তোলা হলে মিশুক তার ভূবন ভাসানো মধুর হাসি হেসে তখন বলে ছিলো – মরার আবার কনো ঠিক আছে নাকি! তুমি ক্যান্সার সার্ভাইবার বলে তুমিই মরবে ঠিক নেই। আমিও তোমার আগে মরতে পারি!দেখবে তুমি আছো,আমি নেই।

মন্টি একের পর আরো দুই বছর এবং এখনো ভালোই বেঁচে আছেন। মিশুকের তার কথা মতই আজ আর নেই। ১১আগস্ট ছিলো মিশুক চৌধুরী,তারেক মাসুদের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিন। তারা ছিলেন বাংলাদেশের সিনেমার নতুন ভবিষৎ। থাকলে বাংলা সিনেমাকে পাহাড় সমান উচ্চতায় সমৃদ্ধ করতেন। তবু স্বল্প জীবনকালে যতটুকু করে গেছেন তাতেই আজ তাদের পরের প্রজন্ম চলচ্চিরকারেরা দুর্গন্ধময় বস্তাপঁচা সিনেমাকে দূর-দূর করে ভালো সিনেমা দর্শকের সামনে একের পর এক তুলে এনে প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে এই হচ্ছে সত্যিকারের সিনেমা। * মিশুকের সেই মৃত্যু সংলাপ বলা ছবিটি নিজের এক্সটার্নাল ড্রাইভের হাজারে হাজার ছবির মধ্যে এতদিন খুজে পাইনি,আজ পেয়েছি বলে শেয়ার করলাম।

স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles