16.1 C
Toronto
সোমবার, জুন ২৭, ২০২২

জলে ভাসা

- Advertisement -
জলে ভাসা
ছবি/ আজিজ আচারকি

আমার ঠিক সামনের টেবিলটিতে দুটো চেয়ার নিয়ে দুজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা বসা । একজনের বয়েস অনুমানিক সত্তর বা বাহাত্তর আর আরকেজনের বয়েস মনে হয় চল্লিশের আশে পাশে হবে। তাদের দিকে তাকিয়ে তাদের বয়েস নির্ধারণ করার দায়িত্ব আমার না এবং তার কোন প্রয়োজন আমার ছিল না। তারপরও তাদের দিকে বার বার আমার চোখ পরছিল। তাদের কথোপকথন শুনে বুঝতে পারলাম এ দুজন মা এবং মেয়ে। আমি কফি শপে এক কাপ কফি ও একটা স্যানডুইচ নিয়ে বসেছি। একটু একটু করে খাচ্ছি আর আই ফোন চোখ বুলাচ্ছিলাম। মা ও মেয়ের সজোরে কথাবার্তা এবং তাদের প্রান খোলা হাসি বারবার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। আমি চোখ তুলে তাদের দিকে তাকালেই চোখাচোখি হচ্ছিল বারবার ।আর মা এবং মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে সৌজন্য হাসি দিচ্ছিল আমিও সে ভাবেই হাসির জবাব দিচ্ছিলাম। তাদের সব কথাই আমার কানে আসছিলো। আমার আর দুজন মহিলার টেবিলের দূরত্ব এতই কম ছিলো যে তারা যদি স্বাভাবিক নিম্ন স্বরেও কথা বলতো তাহলেও হয়তো আমি কিছুতা হলেও শুনতে পেতাম। তাদের কথাবার্তাতে যত টুকু বুঝতে পারলাম মেয়ে নয় মাস যাবত পানিতে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে । সে বর্ণনা এবং অভিজ্ঞতার কথা প্রচুর উত্তেজনা নিয়ে মাকে শোনাচ্ছে আর মা শরীর ঝাঁকিয়ে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। মা অসুস্থ বলে ঘাটে নেমে এসেছে মায়ের সাথে সময় কাটাতে।

পানিতে ভেসে বেড়ানোর ব্যপারটা আমাকে বেশ উৎসাহিত করে তুললো। মুখ ফসকে আমার বেড়িয়ে গেলো নয় মাস তুমি কি করছিলে পানিতে ভেসে। কথাটা জিজ্ঞেস করে নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম নিজের কাছে। কথাটা জিজ্ঞেস করাটা হয়তো আমার ঠিক হোল না। ছিঃ ছিঃ কি ভাবলো মহিলা দুজন নিশ্চয়ই আমি কান পেতে তাদের কথা শুনছিলাম। পরোক্ষনেই বুঝতে পারছিলাম আমার অপ্রস্তুত হওয়ার কোন দরকার ছিল না। মা ও মেয়ে দুজনই নিজেদের পরিচয় দিলো। মেয়ের নাম এলেন আর মা জেনেফার। আমিও আমার নাম বলে এলেন ও জেনেফারের সাথে হাত মিলালাম।

এলেন পরম উৎসাহে পায়ের উপর পা তুলে তার পানিতে ঘুরে বেড়াবার গল্প শুনাতে বশে গেলো। এলেন স্কুল শিক্ষক। এক ছেলে এক মেয়ে । মেয়ের বয়েস আঁট আর ছেলের ছয়। স্বামী মোটামুটি গোছের স্বাধীন ব্যবসা করে। তাদের নিজস্ব বোট আছে। এই বোট থাকা জিনিষটা এখানকার মানুষদের একটা দারুন সখের ব্যপার। ব্যপারটা হাতি পালার মত একটা ব্যপার। বোটের পরিচর্চা প্রচুর । ঠান্ডা তুষার সব মিলিয়ে মোটামুটি ছয় মাস বোট ভিড়িয়ে রাখতে হয়। বাকি ছয় মাসের মধ্যে ভালো আবওহার দিকে নিজর রেখে বোট ব্যবহার শুরু হয়। বড় ছোট মাঝারি সব ধরনের বোট আছে। সবই পারিবারিক বোট। শীতের শেষ বার্তা ঘোষণার সাথে সাথে বোটের মালিকরা নেমে যায় বোট পরিস্কার করে পানিতে নামাবার জন্য। ছুটির দিনগুলোতে ওরা বেড়িয়ে পড়ে বোট নিয়ে। কখনো পরিবার নিয়ে কখনো বন্ধুদের নিয়ে। বোটের ভেতরেই ওরা খাবে ঘুমাবে, ড্রিংক করবে। যাদের মাছ ধরার সখ তারা মাছ ধরে। এখানে বোট কিনতে গেলে আর্থিক সচ্ছলতা ও সখ দুটোই প্রয়োজন। ক্যানাডার মানুষদের এমন অনেক সখ আছে যা দেখলে শুনলে আমাদের উদ্ভট মনে হবে।

এলেন খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে জলে ভাসার গল্প শোনাতে লাগলো। এক বছরের ছুটি নিয়েছে এলেন জলে বোট নিয়ে ঘুরার জন্য। সাথে সাথে ছেলে মেয়েরাও এক বছরের স্কুল বিরতি নিয়েছে। স্বামীর নিজস্ব ব্যবসা কাজেই সেখানেও তেমন কোন সমস্যা নেই।

নয় মাস যাবত এলেন তার পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে লেক থেকে নদী, নদী থেকে সমুদ্রে। মাঝে মাঝে নোঙ্গর করে বিভিন্ন জায়গাতে মাটির ছোয়া পেতে এবং প্রয়োজনও জিনিষ পত্র কেনা কাটা এবং সে জায়গাটা ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। তারপর আবার জলে ভাসা। সেখানেই খাওয়া দাওয়া ঘুমানো যাবতীয় সবকিছু। আমি বড় বড় চোখ করে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম এলেনের দিকে। জিজ্ঞাস করলাম বাচ্চাদের একবছরের জন্য স্কুল থেকে বের করে আনাটা কি ঠিক করেছো মনে হয়? বুঝতে পারলাম আমার এটা অনধিকার চর্চা হচ্ছে তারপরও কেনো জেনো চুপ থাকতে পারলাম না। জেসিকা হেসে জবাব দিলো, আমি বোটে বসে ওদের পড়াশোনা করাই। আমি ভাবতে থাকলাম- বোটের ভেতরে নাই টেলিভিশন, নাই খেলার মাঠ, নাই কোন বন্ধু বান্ধব, আরো কত কিছু বাচ্চাদের করার থাকে অথচ সেসব কোনো কিছুই নাই বোটের ভেতরে।ছোট একটা বোটে চড়ে বাচ্চাগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে বাবা মায়ের সাথে। আমি আবারো জিজ্ঞাস করলাম জেসিকাকে তোমার ছেলে মেয়েরাকি খুশি মনে মেনে নিচ্ছে তোমাদের এই জল পথে ভ্রমন? এলেন আবারো হেসে জবাব দিলো, নাহ সব সময় খুশি থাকছে না আবার খুব বেশী বিরক্তও হচ্ছে না।

আমি এলেনকে বললাম- তোমার ছেলে মেয়েকে লক্ষী বাচ্চা হিসাবে পুরস্কার দেওয়া উচিৎ। আমার ছেলে মেয়ে হলে বোটের ভেতরে বিদ্রোহ ঘোষণা করতো কিংবা পানিতে ঝাপ দিয়ে পালাবার চেষ্টা করতো। আমার কথা শুনে এলেন হেসে গড়িয়ে পড়লো। আরো দুই মাস তাদের জল পথে ভ্রমনের ইচ্ছা ছিলো কিন্তু মা অসুস্থ খবর পেয়ে ভ্রমন বিরতি ঘটাতে হলো বলে এলেনের চেহারাতে কিছুটা দুঃখিত ছাপ ফুটে উঠলো।
এলেন গল্প করা শেষ হোল । আমি ধন্যবাদ জানিয়ে মা মেয়ে দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। হয়তো এলেনের সাথে আমার কোনোদিন আর দেখা হবে না আবার হতেও পারে এই কফি শপে। একজন অপরিচিত মহিলার কাছে তার জলে ভাসার গল্পটা মনে থাকবে অনেকদিন। ফেরার পথে গাড়ি চালাতে চালাতে ভাবছিলাম পৃথিবীতে কতরকমের মানুষ আছে। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে তাদের জীবনকে উপভোগ করে। প্রতিতি মানুষের জীবনের ভাবনাও ভিন্ন।

ম্যাল্টন, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles